হাসেম আলী সেখ : সারা বিশ্ব দেখছে কী নির্মম গণহত্যা চলছে ফিলিস্তিনের ওপর। শিশুহত্যা, বিধ্বংস ও গৃহহীনতা, মানবিক সহায়তায় বাধা, আতঙ্ক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন পার করছে সেখানকার নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। ইতোমধ্যে অনেকে নিজেদের জীবন বাঁচাত বাধ্য হয়ে ছাড়ছে মাতৃভূমি। এত কিছুর পরও সারা বিশ্ব যেন নির্বাক হয়ে বসে দেখছে এই বীভৎস গণহত্যা। ফিলিস্তিন প্রশ্ন আজ কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি মানবিক বিবেক, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন। কয়েক দশকের দখল, নির্যাতন ও অবরোধের পরও ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের ভূমি ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্র্রতি ইউরোপের কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের মতো বড় শক্তির দেশগুলো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী বার্তা। স্বীকৃতির এ ধারা ফিলিস্তিনিদের মনে আশা জাগিয়েছে যে তারা হয়তো অবশেষে মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে নিজেদের জায়গা ফিরে পাবে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে শুধু রাজনৈতিক স্বীকৃতি কি যথেষ্ট? নাকি এই স্বীকৃতি বাস্তব পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়ে কেবল প্রতীকী ঘোষণা হয়েই থেকে যাবে?
ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ এক মানবিক বিপর্যয়। গাজা উপত্যকা ক্রমাগত বোমা বর্ষণ ও অবরোধের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, খাবারের চরম সংকট। ধ্বংস হয়ে গেছে বাড়িঘর, গৃহহীনরা সেখানকার স্কুলগুলো পরিণত হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। হাসপাতালগুলোয় ওষুধের অভাবে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। প্রতিনিয়ত নতুন বসতি নির্মাণ করছে ইসরায়েলিরা, ফিলিস্তিনি কৃষকরা নিজেদের জমি হারাচ্ছেন, সাধারণ মানুষ সেনাদের চেকপোস্টে অপমানিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রের যে মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিজস্ব সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইন প্রণয়ন ও নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিন তার কিছুই বাস্তবে পাচ্ছে না। আজকের ফিলিস্তিনি শিশু জš§ নিচ্ছে এক অচেনা রাষ্ট্রে, যেখানে তাদের জাতীয় পতাকা আছে কিন্তু নিরাপদ শৈশব নেই। রাজনৈতিক স্বীকৃতি কাগজে কলমে থাকলেও মাটির ওপর তাদের জীবন আগের মতোই দুঃসহ। এটাই হলো বর্তমান ফিলিস্তিনের সমস্যার আসল চিত্র।
এই সংকটের কারণ বহু স্তরীয়। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি দখলনীতি ও বসতি সম্প্র্রসারণ। ইসরায়েল গত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে হাজার হাজার নতুন বসতি নির্মাণ করেছে। পশ্চিম তীরের ভেতর শত শত কিলোমিটার জুড়ে স্থায়ী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বিমুখী মানদণ্ড। জাতিসংঘে বহুবার প্রস্তাব পাস হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনের ওপর দখলদারিত্ব অবৈধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বড় শক্তিগুলোর ভেটো রাজনীতি এবং স্বার্থকেন্দ্রিক নীতির কারণে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হতে দেয়া দেয়নি। যারা একদিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বুলি কপচায়, তারাই আবার ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীরব বা পক্ষপাতদুষ্ট।
তৃতীয়ত, ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। গাজায় হামাস এবং পশ্চিম তীরে ফাতাহ দুটি পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত ফিলিস্তিনকে বিভক্ত রেখেছে। এই বিভাজনকে ব্যবহার করছে বহিরাগত শক্তি। ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠ না থাকায় আন্তর্জাতিক সমর্থনও দুর্বল হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, মানবিক অবরোধ ও অর্থনৈতিক ধ্বংস। দীর্ঘদিনের অবরোধে ফিলিস্তিনের অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়েছে। তরুণরা শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার মতো পরিবেশও নেই।
এসব কারণ মিলিয়েই ফিলিস্তিন আজ এমন এক সংকটে দাঁড়িয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ভোগ করতে পারছে না।
ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের করণীয় হচ্ছে স্থায়ী অস্ত্রবিরতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ। ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক বাহিনী বা পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে হবে, যারা ফলে দখলদারিত্ব ও সহিংসতা মতো সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
মানবিক সাহায্য ও ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা ও পশ্চিম তীর পুনর্গঠন ছাড়া স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্কুল, হাসপাতাল, পানি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে। কেবলই রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বাস্তব সাহায্য দরকার। যা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিতে কাজ করবে।
এছাড়া দরকার ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করা। বসতি নীতি চালু থাকলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র টিকে থাকা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই নীতি বন্ধ করতে হবে; যাতে তারা ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখল করে বসতি স্থাপন করতে না পারে।
ইসরায়েলকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তদন্ত ও বিচার চালু করা জরুরি। অপরাধীরা শাস্তি না পেলে দমননীতি চলতেই থাকবে। বিচার প্রতিষ্ঠা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করবে।
ফিলিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে গড়তে হবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য। ফিলিস্তিনিরা যদি নিজেরাই বিভক্ত থাকে, তবে বাইরের স্বীকৃতি তেমন কাজে লাগবে না। গাজা ও পশ্চিম তীরকে এক প্রশাসনের আওতায় এনে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
তাদের প্রয়োজন অর্থনৈতিক সহায়তা ও আত্মনির্ভশীলতা। ফিলিস্তিনের তরুণ প্রজš§কে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় শিল্প, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত গড়ে দিতে হবে। ফলে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন জনগণ নিজেরা আত্মনির্ভশীল হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি আন্তর্জাতিক সমাজে ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের সংগ্রামে নতুন মনোবল জোগায়। কিন্তু এটি একা যথেষ্ট নয়। স্বাধীনতা মানে কেবল কাগজে রাষ্ট্রের নাম নয়, স্বাধীনতা মানে নিরাপদ ঘরবাড়ি, সুস্থ শিশু, মৌলিক অধিকার, চাকরি, অর্থনীতি, আইন ও ন্যায়বিচার।
তাই এখন আন্তর্জাতিক সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি শুধু প্রতীকী ঘোষণা দিয়ে দায় সারবে, নাকি ফিলিস্তিনের বাস্তব মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে? যদি কেবল স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকা হয়, তবে ফিলিস্তিনিরা আরও এক প্রজš§ ধরে দুঃখভোগ করবে। কিন্তু যদি স্বীকৃতির সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপ, মানবিক সাহায্য, দখলনীতি বন্ধ এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ফিলিস্তিনিরা সত্যিই একদিন মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
