সানিয়া তাসনিম লামিয়া : রাত নামলেই শহরটা ধীরে ধীরে নীরব হয়। আলোঝলমলে দোকানপাটের ঝাপ পড়ে। রাস্তার কোলাহল ক্লান্ত হয়ে থামে। তখনই ফুটপাতের ওপর শুয়ে পড়ে কিছু মানুষ—যাদের ঘর নেই, দেয়াল নেই, ছাদ নেই। মাথার ওপরে অসীম আকাশ, নিচে পাথরের ঠান্ডা বুক। শীতের রাতে আকাশটাই তাদের কম্বল আর তারার আলোই একমাত্র বাতি। এই শহরের আরামদায়ক ঘুমের আড়ালে, ফুটপাতে শুরু হয় বেঁচে থাকার নীরব যুদ্ধ।
শীত নামলেই এই যুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দিনের বেলায় যে ফুটপাত মানুষের চলার পথ, রাত নামলেই সেটাই হয়ে যায় কারও একমাত্র আশ্রয়। কংক্রিটের ঠান্ডা শরীর ভেদ করে ঢুকে পড়ে হাড়ের ভেতর। তখন একটি পুরোনো কম্বল হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য। কিন্তু সেই কম্বলও সবার ভাগ্যে জোটে না।
প্রতিবছর শীত এলেই শুরু হয় কম্বলের রাজনীতি। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন আর তথাকথিত মানবিক উদ্যোগে শহর ভরে যায়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে উষ্ণতার নাটক মঞ্চস্থ হয়—কম্বল হাতে হাসি, পাশে ব্যানার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মানবতার ছবি। অথচ ফুটপাতে থাকা মানুষের বাস্তবতা এই আলোকোজ্জ্বল দৃশ্যের অনেক বাইরে। অনেকেই কম্বল পায় না, কেউ পায় খুব দেরিতে, যখন শীত আর অসুখ শরীরের ভেতর শেকড় গেঁড়ে বসে।
ফুটপাতের মানুষদের রাত শুধু ঠান্ডার নয়, অনিশ্চয়তারও। উচ্ছেদের ভয়, পুলিশের তাড়া, চুরি—সব মিলিয়ে ঘুম ভাঙে বারবার। এক টুকরো কম্বলের নিচে কাঁপতে কাঁপতে তারা অপেক্ষা করে ভোরের। এই শহরে উন্নয়নের গল্প যতই বলা হোক, আকাশ যদি কারও কম্বল হয়, তবে সেই উন্নয়ন আসলে কাদের জন্য—এই প্রশ্নটাই ফুটপাত আমাদের নীরবে মনে করিয়ে দেয়।
ফুটপাতে শীতার্ত মানুষের এই করুণ অবস্থার পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং এটি বহু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল। প্রথম ও প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য। গ্রাম থেকে কাজের আশায় শহরে আসা অসংখ্য মানুষ স্থায়ী কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফুটপাতেই ঠাঁই নেয়। শহরের উন্নয়ন যত দ্রুত বাড়ে, গরিব মানুষের জীবনে তার সুফল ততটা পৌঁছায় না।
দ্বিতীয় বড় কারণ হলো বাসস্থান সংকট ও নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা প্রায় নেই। বস্তি উচ্ছেদ হলেও বিকল্প পুনর্বাসন হয় না। ফলে উচ্ছেদের পর মানুষ বাধ্য হয় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে। শীতকালে এ বাস্তবতা আরও নির্মম হয়ে ওঠে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে আসে রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা। শীত আসবে—এটা নতুন কিছু নয়। তবু শীতকালীন আশ্রয়কেন্দ্র, পর্যাপ্ত কম্বল বিতরণ বা স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতি যথেষ্ট থাকে না। সরকারি উদ্যোগ সীমিত ও অপ্রতুল হওয়ায় ফুটপাতের মানুষরা পড়ে থাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মৌসুমি মানবিকতা ও কম্বলের রাজনীতি। শীত এলেই কিছুদিনের জন্য মানবিকতার জোয়ার দেখা যায়—ছবি তোলা, ফেসবুক পোস্ট, সাময়িক বিতরণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ খুব কমই নেওয়া হয়। ফলে শীত চলে গেলে সমস্যাও যেন চোখের আড়ালে চলে যায়।
সবচেয়ে গভীর কারণটি লুকিয়ে আছে সামাজিক উদাসীনতায়। আমরা অনেক সময় এই মানুষগুলোকে শহরের স্বাভাবিক দৃশ্য হিসেবে মেনে নিই। তাদের কষ্ট আমাদের বিবেককে আর নাড়া দেয় না। ফলে ফুটপাতে ঘুমানো মানুষদের শীত শুধু প্রকৃতির নয়—এটি আমাদের সম্মিলিত অবহেলা ও ব্যর্থতার ফল; যা প্রতিবছর একইভাবে ফিরে আসে।
শীতকালে ফুটপাতে থাকা মানুষের প্রধান সমস্যা শুরু হয় আশ্রয়ের অভাব থেকে। মাথা গোঁজার মতো নিরাপদ কোনো স্থান না থাকায় তারা খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাতে বাধ্য হয়। কংক্রিটের ঠান্ডা মাটি শরীরের তাপ শুষে নেয়। ফলে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা দ্রুত দেখা দেয়। অনেকের কাছে পর্যাপ্ত গরম কাপড় বা কম্বল না থাকায় শীত তাদের জন্য জীবননাশের কারণও হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। শীতের সময় সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, জ্বর ও চর্মরোগ ফুটপাতের মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু চিকিৎসার সুযোগ তাদের জন্য অত্যন্ত সীমিত। সরকারি হাসপাতালের দূরত্ব, খরচ ও অবহেলা—সব মিলিয়ে অসুখ তাদের কাছে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করতে না পারলে তাদের দৈনিক আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।
আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো নিরাপত্তাহীনতা। রাতে ফুটপাতে ঘুমানোর সময় চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা এবং পুলিশের উচ্ছেদের ভয় সবসময় তাড়া করে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অনেক সময় মাঝরাতে তাড়িয়ে দেওয়া হলে তারা আরও অনিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবও শীতকালে আরও প্রকট হয়। শীতে কাজের সুযোগ কমে গেলে নিয়মিত খাবার জোটে না। ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধোয়া বা গোসল করা অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মানুষ। ফুটপাতে থাকা মানুষগুলো ধীরে ধীরে সমাজের চোখে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তাদের কষ্ট কেউ গণনায় আনে না। ফলে শীত তাদের জন্য শুধু ঋতু নয়—এটি এক দীর্ঘ, নীরব যন্ত্রণা।
ফুটপাতে শীতার্ত মানুষের দুরবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি সমাধান হলো রাষ্ট্রের সক্রিয় ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি শহরে পর্যাপ্ত শীতকালীন আশ্রয়কেন্দ্র চালু করতে হবে, যেখানে রাত কাটানোর নিরাপদ স্থান, গরম বিছানা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ থাকবে। এসব আশ্রয়কেন্দ্র যেন কেবল নামমাত্র না হয়ে বাস্তবে কার্যকর হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণে সমন্বয় ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ব্যক্তি বা সংগঠনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি কেন্দ্রীয় তালিকা ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রকৃত শীতার্ত মানুষই অগ্রাধিকার পায়। কম্বলের রাজনীতি নয়, মানবিক দায়িত্বই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
তৃতীয় সমাধান হলো স্বাস্থ্যসেবার সহজ প্রাপ্যতা। শীতকালে ফুটপাতে থাকা মানুষের জন্য ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সেবা চালু করা যেতে পারে। বিনামূল্যে ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি রেফারেলের ব্যবস্থা থাকলে অনেক প্রাণরক্ষা পাবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান। অস্থায়ী সাহায্যের পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের আবাসন, রাত্রীকালীন আশ্রয় ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।
সবশেষে সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। ফুটপাতে থাকা মানুষগুলোকে বোঝা নয়, নাগরিক হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। শীতের সমাধান শুধু কম্বলে নয়—দায়িত্বশীল রাষ্ট্র, সচেতন সমাজ ও দীর্ঘস্থায়ী নীতিতেই প্রকৃত উষ্ণতা নিহিত।
শীতকালে ফুটপাতে থাকা মানুষের অবস্থা কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক মানবিকতার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করে। উন্নয়ন, স্মার্ট সিটি কিংবা আধুনিক নগরের যে গল্প আমরা বারবার শুনি, ফুটপাতের এই মানুষগুলো সেই গল্পের সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদ। কারণ উন্নয়ন যদি সবার জন্য না হয়, তবে তা কেবল সংখ্যার সাফল্য, মানবিক অগ্রগতি নয়।
ফুটপাতে ঘুমানো কোনো মানুষের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার ফলেই মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। অথচ আমরা প্রায়ই দায় চাপাই তাদের জীবনচর্যার ওপর, যেন দারিদ্র্যই তাদের অপরাধ। এ দৃষ্টিভঙ্গিই সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
কম্বল বিতরণ, দান-খয়রাত কিংবা মৌসুমি সহানুভূতি অবশ্যই অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং অনেক সময় তা জীবন বাঁচায়। তবে এগুলো যদি দীর্ঘমেয়াদি নীতির বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেখানেই বিপত্তি। মানবিকতা তখন দায়িত্ব নয়, প্রদর্শনীতে রূপ নেয়। শীত চলে গেলে আমরা যেন আবার ভুলে যাই—ফুটপাতের মানুষগুলো তখনও রয়ে যায়।
শীতের রাতে ফুটপাতে ঘুমানো মানুষদের দিকে তাকানো মানে আয়নায় নিজের সমাজকে দেখা। আকাশ যদি কারও কম্বল হয়, তবে সেটি কেবল প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা নয়—এটি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতার ফল। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—এই তিনের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই বাস্তবতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রকৃত মানবিকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন শীত এলেই নয়, সারা বছরজুড়েই ফুটপাতের মানুষদের জীবন আমাদের বিবেককে নাড়া।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
