শেয়ার বিজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন কাণ্ড করলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই জেরোম পাওয়েলের বিরোধিতা করেছেন। পাওয়েলকে যা-তা ভাষায় অপমান করেছেন। বারবার বলেছেন, তিনি পাওয়েলকে পদচ্যুত করবেন। খবর: সিএনএন।
পাওয়েল এত দিন চুপ করেই ছিলেন। পাওয়েল বরাবর নিরপেক্ষ ছিলেন। তিনি বলেছেন, তার একমাত্র কাজ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। বাকি কোনো কিছু তার কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু এবার ফেডের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত যেমন অভূতপূর্ব ঘটনা, তেমনি পাওয়েল ট্রাম্প সম্পর্কে যা বললেন, তাও নজিরবিহীন।
মার্কিন বিচার বিভাগ পাওয়েলের বিরুদ্ধে সমন জারি করার পর ট্রাম্প কার্যত তাকে চাপে ফেলেছিলেন। কিন্তু পাওয়েল এ ক্ষেত্রে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। নিজের ভূমিকার ব্যাখ্যায় না গিয়ে তিনি বরং ট্রাম্প প্রশাসন যে ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ করেছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
গত রোববার রাতে প্রকাশিত দুই মিনিটের চমকপ্রদ ভিডিওতে পাওয়েল বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য মামলার হুমকি মূলত ট্রাম্পের খেয়ালখুশি বাস্তবায়নের জন্য সাধারণ আমেরিকানদের জীবিকা ঝুঁকির মুখে ফেলার শামিল।
পাওয়েলের ভাষায়, ফেডারেল রিজার্ভ যেটা সবচেয়ে ভালো মনে করেছে, সেটাই করেছে। জনস্বার্থে কী প্রয়োজন, তার ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তার ফল হিসেবেই ফেডারেল রিজার্ভকে ফৌজদারি অভিযোগের হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে প্রেসিডেন্টের পছন্দ অনুযায়ী কাজ না করার কারণে এই পরিস্থিতি।’ তিনি বলেন, ফেড কি তথ্য-প্রমাণ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণ করতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক চাপ ও ভীতির মাধ্যমে আর্থিক নীতি প্রণয়ন করবে—বিষয়টি এখন এ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
পাওয়েল এই প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও জোরালোভাবে কথা বললেন। ফলে পাওয়েলের অবস্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতায় গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। তিনি মনে করেন, ফেডের স্বাধীনতাই হলো মার্কিন জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করার ক্ষেত্রে ফেডের মূল লক্ষ্য পূরণের অপরিহার্য শর্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখা যে অপরিহার্য, সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাবেক ফেড কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য আছে। এই স্বাধীনতার কারণেই যে নীতিনির্ধারকেরা সুদের হার নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এটা সবাই জানেন। এসব সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়, হোয়াইট হাউসের কে ক্ষমতায় আছেন, তার খেয়ালখুশির ওপর ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিতে গতি আনতে এবং শেয়ারবাজার চাঙা করতে সুদের হার কমাতে চাইতেই পারেন। কিন্তু সেই নীতি যদি লাগামহীন মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ নাগরিকদেরই।
গত এক বছরে ট্রাম্পের লাগাতার চাপের মুখেও পাওয়েল ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সুদের হার নির্ধারণে ফেডের স্বাধীনতার পক্ষে সরব থেকেছেন।
গত বছরের জুলাই মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের আক্রমণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পাওয়েল সরাসরি বিতর্কে জড়াননি। তবে দীর্ঘ ব্যাখ্যায় তিনি ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন।
সুদের হার কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের দাবির বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—ফেড যদি সত্যিই সে পথে হাঁটে, তাহলে তা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে, এমন ঝুঁকি আছে। গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ফেড টানা তিন দফা সুদের হার কমালেও ট্রাম্প তাতেও সন্তুষ্ট নন; তিনি আরও কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সুদ বিশ্বের সর্বনিম্ন সীমার মধ্যে থাকা উচিত। শুধু তা-ই নয়, সুদের হার নির্ধারণের সিদ্ধান্তে তার মতামত থাকা দরকার।
রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি এড়াতে কয়েকজন ফেড-পর্যবেক্ষকের মত হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত আরও কিছুদিন পিছিয়ে দিতে পারে। অন্য কথায়, ফেডের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা উল্টো ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এতে ভবিষ্যতে সুদের হার কমার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। এমনকি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পাওয়েল ফেডের পর্ষদে থাকতে চাইতে পারেন, এমন সম্ভাবনা জোরালো হতে পারে। ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৫ মে। তবে বোর্ড অব গভর্নরের গভর্নর হিসেবে তার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত।
ডিসেম্বরে সুদহার কমিয়েছে ফেডারেল রিজার্ভ। তখন সিএনএনের প্রশ্নের জবাবে পাওয়েল বলেন, তার ভাবনা একটাই—যিনি তার জায়গায় আসবেন, তার হাতে ভালো পরিবেশে (অর্থনৈতিক) দায়িত্ব হস্তান্তর করা। চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পঘনিষ্ঠরা পাওয়েলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারকাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে এই সংস্কার প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, ২০২৫ সালের জুন মাসে সিনেটরদের কাছে সংস্কারের কিছু দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাওয়েল শপথ ভঙ্গ করে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে অনেক রিপাবলিকানের কাছে পাওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি স্বস্তিকর ঠেকছে না। নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস, আলাস্কার সিনেটর লিসা মারকাউস্কি ও আর্কানসাসের প্রতিনিধি ফ্রেঞ্চ হিল—রিপাবলিকান পার্টির এমন বেশ কয়েকজন নেতা এ নিয়ে প্রকাশ্যে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পঘনিষ্ঠরা পাওয়েলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারকাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে এই সংস্কার প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের জুন মাসে সিনেটরদের কাছে সংস্কারের কিছু দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাওয়েল শপথ ভঙ্গ করে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা পিটার নাভারো গত সোমবার ফক্স বিজনেসকে বলেন, ‘আমরা জানি, তিনি মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছেন।’
এদিকে জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একযোগে ফেড চেয়ারম্যানের প্রতি ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করেছে। সুদের হার নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সই করেছেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি), ব্যাংক অব কানাডার প্রধানসহ মোট ১১ জন শীর্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকার। খবর: বিবিসি।
ফেডারেল রিজার্ভ ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মনে রাখা দরকার, যুক্তরাষ্ট্রের এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পূর্ণ সরকারি বা সম্পূর্ণ বেসরকারি কোনোটাই নয়। এর পরিচালনা পর্ষদ ফেডারেল সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এই নিয়োগ দেন। নিয়োগে অনুমোদন দেয় সিনেট। পর্ষদের কাজ জাতীয় মুদ্রানীতি তত্ত্বাবধান করা। এর সঙ্গে ১২টি আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাংক যুক্ত। এগুলো আবার বেসরকারি করপোরেশন হিসেবে গঠিত এবং সদস্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মালিকানাধীন। এই ব্যাংকগুলো চেক ক্লিয়ারিংয়ের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে ডিভিডেন্ড পরিশোধের পর মুনাফা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা দেয়।
ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম কয়েকটা কমিটি এবং ১২টি আঞ্চলিক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নিয়ে গঠিত। প্রতিটি অঞ্চলের প্রাইভেট ব্যাংকগুলো আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাংকের শেয়ার ধারণ করে, তবে এই শেয়ার সহজে হস্তান্তরযোগ্য নয়। শেয়ারগুলো থেকে লভ্যাংশ পাওয়া যায়, কেননা সদস্য ব্যাংকগুলোকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বিনা সুদে রিজার্ভ জমা রাখতে হয়। লভ্যাংশ ও পরিচালন ব্যয় বাদে রিজার্ভের বাকি মুনাফা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারিতে যায়। প্রতিটি আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাংক বছরে একবার অভ্যন্তরীণ দল, সরকারি হিসাবরক্ষণ অফিস ও একটি তৃতীয় পক্ষের বেসরকারি হিসাবরক্ষণ ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষিত হয়।
ফেডারেল রিজার্ভের নীতিসুদের হার, রিজার্ভের প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি পরিচালনা পর্ষদ ও ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি দ্বারা নির্ধারিত হয়। গভর্নরদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নিয়োগ দেন। বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল ট্রাম্পের প্রথম জামানায় চার বছরের জন্য নিয়োগ পান। এরপর ২০২২ সালে তিনি দ্বিতীয়বার নিয়োগ পান।
বিষয়টি হলো, ফেডারেল কীভাবে কাজ করবে, তার অনেক আইন আছে, তবে মার্কিন সরকারের নীতিনির্ধারণের সরাসরি কোনো ক্ষমতা নেই।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post