Print Date & Time : 29 April 2026 Wednesday 8:05 pm

ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করতে চাইলে অবিলম্বে সৃষ্ট জট খোলার ব্যবস্থা করতে হবে: সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে

রেজাউল করিম খোকন : এই মুহূর্তে সবার মনে একটি প্রশ্ন—‘শেষ পর্যন্ত কী ঘটতে চলেছে দেশে?’ চরম এক অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে। দারুণ হতাশা, পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, অবিশ্বাস, বিদ্বেষ এবং নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের আলামত লক্ষ করা যাচ্ছে। ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে সবার সর্বসম্মতিক্রমে ও সমঝোতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম, এবার বাংলাদেশ সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে যে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা ও অনিয়ম চলছিল, তা কাটিয়ে এবার একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে দেশে, তেমন আশায় বুক বাঁধলেও এখন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সবকিছু তছনছ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। চব্বিশের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী শেখ হাসিনার দুঃশাসন হটাতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ছাত্র-জনতা, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। অগ্নিঝরা ৩৬ দিনের আন্দোলনে শামিল দেশের মানুষের সামনে টিকতে না পেরে স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। সেটা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অসাধারণ অধ্যায়ের সূচনা। গোটা বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছিল ‘লৌহমানবী’ হিসেবে কুখ্যাত স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার ভয়ানক পতন। দেশে ভয়ংকর একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বলতে হয়, সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিব কোথা? দেশের এক জায়গায় মলম লাগাবেন আরেক জায়গায় ফোড়া বের হবে। টোটকা-ফোটকায় কাজ হবে না। একটা সামাজিক বিপ্লব আজকে ফরজ হয়ে গেছে। কেউ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না, আমরা আমজনতা ঠকি। কেন ঠকি? জমি বর্গা দেয়া যায়, স্বার্থ বর্গা দেয়া যায় না। যারা এতদিন দেশ চালিয়েছে, লুটপাটতন্ত্র কায়েম হয়েছে। লুটপাটের রাজত্ব বহাল রাখার জন্য মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে। এমনকি ভোটাধিকার পর্যন্ত হরণ করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক দুর্যোগের ঘনঘটা। একটা গভীর সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ নিপতিত হচ্ছে। একটা গভীর খাদের কিনারে এসে বাংলাদেশ উপনীত হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কোনো সংস্কার তখনই টেকসই হয়, যখন তা রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালের ১২তম সংশোধনী তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে শাসনব্যবস্থার রূপান্তর হয়েছিল সংসদীয় ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, দলীয় বিভাজন এত গভীর যে, ‘ঐকমত্য’ শব্দটাই অনেকের কাছে সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। তাই কমিশনের প্রস্তাব কেবল সংবিধান সংস্কার নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠনেরও একটি সুযোগ। অবশ্য এ কথাও অস্বীকার করা যায় না যে, বাংলাদেশের জনগণ এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিচার বিভাগের জবাবদিহি ও সেবা প্রদানে কার্যকারিতা চায়। কমিশনের সুপারিশে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকায় এটি নিঃসন্দেহে নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে, বিচারব্যবস্থায় গতি আসবে এবং রাষ্ট্রের সেবাদান প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল হবে। রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া এসব কাঠামোগত পরিবর্তন কেবল উপসর্গ নিরাময়ের সমাধান, মূল রোগ থেকে মুক্তি নয়। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একদিকে আছে সংস্কারের আশাবাদ, অন্যদিকে রয়েছে আস্থার সংকট। এ দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি। সংবিধান কোনো দলীয় দলিল নয়; এটি জনগণের চুক্তি। সেই চুক্তি যদি জনগণের চোখের আড়ালে সংশোধিত হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। যদি স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এ সংস্কার সম্পন্ন হয়, তবে এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সংস্কারের প্রক্রিয়াকে রাজনীতির প্রতিযোগিতা নয়, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।

অনেক আলোচনা ও বিতর্কের পর ১৭ অক্টোবর বৃষ্টিস্নাত বিকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বেশ ঘটা করে ২৫টি দল জুলাই সনদে সই করেছিল; চারটি বামপন্থি দল রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তন করার প্রতিবাদে সনদে সই দেয়নি, তাতে অবাক হইনি। কিন্তু ছাত্রনেতৃত্ব থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি, যারা জুলাই সনদের দাবিটি প্রথম তুলেছিল, তাদের সই না দেয়াটা অস্বাভাবিক ঠেকেছে। এটা নিয়ে তারা যে দর-কষাকষি করছে, তার পেছনে কি নীতিগত অবস্থান, না ভোটের হিসাব-নিকাশ মুখ্য ছিল, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি দেয়ার লক্ষ্যে যে সুপারিশমালা পেশ করেছে, তা নিয়ে রাজনীতির মাঠ বেশ গরম। বিএনপিসহ বেশ কিছু দল একে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও তামাশা বলেও অভিহিত করেছে। আবার কেউ কেউ স্বাগতও জানিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, জুলাই সনদ ও আইনি ভিত্তি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হতে পারলে নির্বাচন হবে কীভাবে?

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এ ছাড়া আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ এটা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ আদেশ জারি করে তার ভিত্তিতে গণভোট হবে। গণভোটে প্রস্তাব পাস হলে আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। তবে গণভোট কবে হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে গণভোট কি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে হবে, নাকি আগে হবে। যে আদেশের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত করা হবে, তার নাম হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। বাকি প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। এ বিষয়ে দলগুলোর মতৈক্য আছে। মূল বিতর্ক সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। সনদ ও গণভোটের আইনি ভিত্তি, গণভোটের সময় ও পথ-পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা আছে। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশন দুটি বিকল্প সুপারিশ করেছে। একটিতে বলা হয়েছে, ২৭০ দিনের মধ্যে আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে। সে ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বিল আকারে আদেশের তফসিলে থাকবে। অন্য সুপারিশ অনুযায়ী, গণভোট হবে আদেশ ও আদেশের তফসিলে থাকা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর। তবে দুটি বিকল্প উপায়ের কোনোটিতেই সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোটে রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) গুরুত্ব পাবে না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ঐকমত্য কমিশন যেভাবে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়িত হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের জমা দেয়া সুপারিশকে ইতিবাচকভাবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে বিএনপি এতে অনেকগুলো অসংগতি দেখছে। এমনকি ঐকমত্য কমিশন ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে অনৈক্য প্রতিষ্ঠার একটা প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে যে কিছু অসংগতি রয়েছে, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতের কথা উল্লেখ ছিল। বলা হয়েছিল, সব রাজনৈতিক দল এই ভিন্নমতগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করে জনগণের সম্মতি গ্রহণ করবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের গণভোটের প্রস্তাবে এই ভিন্নমতগুলো রাখা হয়নি। আরেকটি বড় অসংগতি হলো সংবিধান সংস্কারের জন্য ২৭০ দিনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। ২৭০ দিন পেরিয়ে গেলে সংস্কার প্রস্তাব কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে? তাহলে সংসদে আলাপ-আলোচনা, তর্কবিতর্কের কী মূল্য থাকল? ভুলে গেলে চলবে না, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান সংস্কারের বৈধতা আসে আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পাওয়া নৈতিক সম্মতি থেকে, কোনো সময়সীমার বাধ্যবাধকতা থেকে নয়। যে বিষয়টি সবার মনে রাখা দরকার, তা হলো জোর করে বা চালাকি করে কোনো সংস্কার চাপিয়ে দেয়া যায় না। সে রকম হলে সংস্কার টেকসই হবে না। এর আগে বিভিন্ন সময়ে এ রকম চেষ্টা দেখা গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থই হয়েছে। সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষ, অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার, ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জুলাই সনদ’ ও ঐকমত্য কমিশনের সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে। এক কথায় বলা যায়, সব মহলে এ বিষয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর চিন্তার প্রতিফলন। এ বিষয়ের সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। কমিশনের প্রস্তাবগুলো একদিকে রাজনৈতিক সংস্কারের সাহসী পদক্ষেপ, অন্যদিকে এগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে নানা জটিলতা, দ্বন্দ্ব ও আশঙ্কা। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, যাতে সংসদ তার ইচ্ছামতো সংবিধান পরিবর্তন করতে না পারে।’ এ বক্তব্য মূলত একটি মৌলিক নীতির প্রতিফলন, যেখানে সংবিধানকে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। তাই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব, যেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে পারস্পরিক অংশগ্রহণ ও সমঝোতার ভিত্তিতে, তা নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগামী ভাবনা।

তবে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন হলো—এ সংস্কারের প্রক্রিয়া কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে? ঐকমত্য কমিশন বলছে, সংবিধান সংশোধনের বাইরের ৯টি সুপারিশ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার, সরকারি সেবা ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি। এসব উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও প্রশ্ন জাগে—নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যখন সংস্কার করা হয়, তখন সংসদীয় বিতর্ক বা বিরোধী মতামতের সুযোগ কতটা থাকে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রায়ই অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। ফলে এ দ্রুততা কখনো কখনো অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার জায়গায় ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তাই গতি আর গণতন্ত্রের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রয়োজন, তা রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তিনটি বলয় তৈরি হয়েছে। একটি বলয় হলো বিএনপি ও তাদের সমর্থক-অনুসারী দল। আরেকটি হলো জামায়াতে ইসলামী ও এর অনুসারী দল। তৃতীয়টি হলো জাতীয় নাগরিক পার্টি। আবার কোনো কোনো দল দুই নৌকায় পা দিয়ে রেখেছে। যেখানে গিয়ে ভোটের মাঠে সুবিধা করা যাবে, শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যাবে। মাঠে সক্রিয় থাকা ৩০টি রাজনৈতিক দলকে নিয়েই সরকার তথা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ আট মাস ধরে আলোচনা করে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৪৮টি বিষয় যেহেতু সংবিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেহেতু এগুলোর আইনি ভিত্তি তৈরির জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যা নিয়ে আবার মতভেদ দেখা দিয়েছে। যদিও সনদ তৈরির সময় বলা হয়েছিল, তারা আইনি ভিত্তির সুপারিশ করবে না। কিন্তু অসমাপ্ত সনদ করতে গিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আরও জট পাকিয়ে ফেলেছে। যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তীব্র, তার একটি হলো গণভোটের তারিখ। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অনুসারীরা বলছে, নভেম্বরেই গণভোট হতে হবে। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের অনুসারীদের দাবি, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হতে পারবে না। তারা মনে করেন, আগে গণভোটের দাবি তোলা নির্বাচনকে পিছিয়ে দেয়ার দুরভিসন্ধি ছাড়া কিছু নয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন অবশ্য দুই বিকল্প প্রস্তাবই সরকারের কাছে পেশ করেছে। সমস্যা হলো যিনি সরকারপ্রধান, তিনি ঐকমত্য কমিশনেরও প্রধান। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে—কে কার কাছে প্রস্তাব পেশ করেছেন। দ্বিতীয়ত, জুলাই সনদে ঐকমত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের আপত্তিগুলো লিপিবদ্ধ হলেও আইনি ভিত্তির সুপারিশে বাদ দেয়া হয়েছে। বিএনপি ও তাদের অনুসারীদের প্রধান আপত্তি এখানেই। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, যেসব বিষয় রাজনৈতিক দলগুলো আপত্তি জানিয়েছে, নির্বাচনে তারা জনগণের রায় পেলে সেটি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য নয়। কিন্তু আইনি ভিত্তিতে যখন সেটি বাদ দেয়া হয়েছে এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে সেটি অনুমোদন করে নিলে সংসদের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হবে। তাদের তৃতীয় আপত্তির জায়গা হলো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আইনি ভিত্তি অনুমোদিত হয়ে যাওয়া। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বলেছে, যদি ৯ মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ উল্লিখিত বিষয়ে আইন পাস না করে, তাহলে সেটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অনুমোদিত হয়ে যাবে। ঐকমত্য কমিশনের এই আইনি ভিত্তির সঙ্গে ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খান প্রণীত এলএফওর মিল খুঁজেও পেয়েছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

সিদ্ধান্তটি কবে হবে, কেমন হবে? যদি একই দিনে দুই ভোট করার পক্ষে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে জামায়াত ও এনসিপি কি মেনে নেবে? আর যদি সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হয়, বিএনপি কি তা গ্রহণ করবে? যদি না করে, কী পরিস্থিতি তৈরি হবে? রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদের পক্ষে এনে সরকার যতটুকু বাহবা পেয়েছিল, তার চেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে আইনি ভিত্তি দিতে গিয়ে। এখানে কোনটি ন্যায্য, কোনটি অন্যায্য; তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে একমতে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যেমন একে অপরকে বিশ্বাস করবে না, তেমনি তাদের বড় অংশ সরকারের প্রতিও আস্থাশীল নয়। নির্বাচনের বিষয়ে শুরু থেকে সরকারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন সন্দেহ বাড়িয়েছে, তেমনি সরকারের প্রতিও একধরনের অনাস্থা সৃষ্টি করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেড় ঘণ্টা কথা বলে দুই দেশের উদ্বেগজনক বাণিজ্য বিরোধের মীমাংসা করতে পারলেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর বিজ্ঞ নেতারা দীর্ঘ আলোচনা করে ঠিক করতে পারছেন না—কীভাবে নির্বাচন ও সংস্কার কাজটি করা যাবে। সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের যেখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কথা ছিল—রাজনৈতিক দলের সংস্কার, সেখানেই তারা কম গুরুত্ব দিয়েছে। তারা এই একটি বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিলে রাষ্ট্রীয় ও রাজনীতির সংস্কারকাজ অনেকটা সহজ হতো। এখন রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের চাপে সনদে যতই সই করুক না কেন কাজ করবে তাদের মতো করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংবিধানের দাঁড়ি, কমা ও সেমিকোলন নিয়ে যতটা ব্যস্ত ছিল, রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়ণ নিয়ে ততটাই উদাসীন থেকেছে। জুলাই সনদের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে আসতে না পারলে নির্বাচনের অনিশ্চয়তা কাটবে না। সরকার বলছে, তারা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজি করাতে না পারলে কীভাবে সেই নির্বাচন হবে? প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন সামনে রেখে বড় আক্রমণের আশঙ্কার কথা বলেছেন। সেই আশঙ্কা মোকাবিলার দায়িত্ব তো সরকারকেই নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন যত বাড়বে, আক্রমণের আশঙ্কাও তত জোরদার হবে। এই সহজ সত্যটি সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করতে চাইলে অবিলম্বে সৃষ্ট জট খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসতে হবে। সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক