Print Date & Time : 21 May 2026 Thursday 5:55 am

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর তদন্ত কমিটি গঠন

প্রতিনিধি, গাজীপুর : বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া আন্দোলন, প্রশাসনিক উত্তেজনা এবং পরবর্তী তদন্ত কমিটি গঠনকে ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একপক্ষ ঘটনাকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন’ হিসেবে দাবি করলেও অপরপক্ষ বলছে, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা। প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত করাই এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

গত ৩ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ড. মো. আমিনুল ইসলামকে ব্রির মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের একাংশ শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।

আন্দোলনকারীরা ড. আমিনুল ইসলামকে ‘ফ্যাসিবাদপন্থী’ হিসেবে বিবেচনা করে তার নিয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাদের ভাষ্য, ৩ মে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত বিক্ষোভ এবং পরদিন ৪ মে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ব্রি ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কর্মসূচি চলাকালে ব্রির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ড. মো. আনোয়ার হোসেন বহিরাগত লোকজন এনে মোটরসাইকেল শোডাউন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আন্দোলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে এবং তা যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তবে, এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয় ড. মো. আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত তাদের অবস্থানকে যৌক্তিকতা দেয় এবং তারা এটিকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সফলতা’ হিসেবে দেখছেন।

তবে ঘটনার বিপরীত চিত্রও উঠে এসেছে। ব্রির প্রশাসনিক ও বিজ্ঞানী মহলের একটি অংশের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালককে অফিসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, বিভিন্ন দপ্তর ও গবেষণাগারে তালা লাগানো হয় এবং প্রশাসনিক ও গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সিসিটিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। যদিও আন্দোলনকারী পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ২০ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা-৩ অধিশাখা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, জড়িতদের চিহ্নিতকরণ, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ। তবে, তদন্ত কমিটি গঠনকে ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ গঠন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে এখনও ফ্যাসিস্টের প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে, যারা ব্রিকে আবারও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে গবেষণা-৩ শাখার ফ্যাসিস্টের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলেছেন তারা, যদিও এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারী ও বিজ্ঞানীদের একাংশ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে যদি আবারও কোনো ‘অযৌক্তিক প্রভাব’ বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, তাহলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবেন ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনকারীরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রির বর্তমান সংকট শুধু একটি নিয়োগ বিতর্ক নয়। এর পেছনে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার রাজনীতি, নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অসন্তোষ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা গবেষণা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।