Print Date & Time : 18 April 2026 Saturday 6:06 am

ফ্লাইট শঙ্কা মাথায় নিয়েই আত্মশুদ্ধির সফর শুরু

এফ আই মাসউদ: বৈশ্বিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আকাশপথে বিঘ্নÑ সবকিছুর মাঝেই শুরু হচ্ছে পবিত্র হজযাত্রা। ফ্লাইট বাতিল ও জ্বালানি সংকটের শঙ্কা থাকলেও থেমে নেই ধর্মপ্রাণ মানুষের আত্মশুদ্ধির এই মহাসফর। অনিশ্চয়তার মেঘের আড়ালেও অটুট রয়েছে বিশ্বাসÑ কাবাঘরের পানে এগিয়ে চলা লাখো মানুষের প্রার্থনা, ধৈর্য আর আস্থা। প্রতিবছর পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশে সারা বিশ্বের লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা একত্রিত হন মক্কায়। অন্য দেশের মতো বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীরা পবিত্র এই নগরীর উদ্দেশে রওনা হবেন। প্রত্যকের গন্তব্য পবিত্র কাবাঘর যেখানে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় তারা নিবেদন করবেন নিজেদের সকল প্রার্থনা, সকল আকুতি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ত্রিমুখী সংঘাত এবং দক্ষিণ লেবাননে অস্থিরতা চলমান রয়েছে। কার্যকর যুদ্ধবিরতি না থাকায় অঞ্চলটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক আকাশপথ বিঘ্নিত হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সতর্কতাও দিয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ১০৬০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রাখার কারণে এসব ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
বেবিচক জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত ৩৩৯টি, ১০ মার্চ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ২৭৫টি, ২০ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ২২৬টি, ৩০ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬০টি এবং ৯ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ৬০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে
ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক বিমান সংস্থা বিকল্প রুট বা নতুন সময়সূচি দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
এদিকে দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১৪ ও ১৫ এপ্রিল দু’দিনে ৩২টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সফলভাবে ওঠানামা করেছে। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ১৪ ও ১৫ সারাদিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে ১৭টি যাত্রীবাহী এরাইভাল (আগত) ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করেছে এবং ১৫টি ডিপার্চার (বহির্গামী) ফ্লাইট বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সালাম এয়ার, এয়ার আরাবিয়া ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুবাই, শারজাহ ও আবুধাবি রুটের ফ্লাইটগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে।
তবে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও কারিগরি ও শিডিউলজনিত কারণে গত দুই দিনে মোট ৭টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত দুটি ও একটি বহির্গামী ফ্লাইট। এয়ার আরাবিয়ার শারজাহ থেকে আগত ও বহির্গামী দুটি ফ্লাইট। সালাম এয়ারের মাস্কাট রুটের দুটি ফ্লাইট।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধাবস্থার কারণে বিমানবন্দরে বড় ধরনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছিল। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বুধবার পর্যন্ত এই যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে শাহ আমানত বিমানবন্দরে সর্বমোট ৩১৩টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে।
এ ছাড়া ইউরোপে উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য জেট ফুয়েলের মজুত ‘ছয় সপ্তাহের মতো’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল। বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ অব্যাহতভাবে বাধাগ্রস্ত হলে খুব শিগগির ফ্লাইট বাতিল শুরু হতে পারে। হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা সম্ভবত আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছি, যার বৈশ্বিক প্রভাব পড়বে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এই নৌপথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাড এনার্জি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জেট ফুয়েলের এই তীব্র স্বল্পতার কারণে আগামী মে মাস থেকেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট বাতিল শুরু হতে পারে।
এই শঙ্কার মধ্যেই আজ রাতে চলতি বছরের হজ ফ্লাইট কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার রাত ১১টা ৩০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে হজ ফ্লাইট কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রসারিত ফ্লাইটসূচি ও ভাড়া কমানোর উদ্যোগসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর হজ ফ্লাইট শুরু হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে এ বছর মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজ পালন করতে সৌদি আরবে যাবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজযাত্রী যাবেন। মোট হজযাত্রীর প্রায় ৫০ শতাংশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে ভ্রমণ করবেন, আর বাকি যাত্রীরা সৌদিয়া ও ফ্লাইনাস ব্যবহার করবেন।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এ বছর উদ্বোধনী হজ ফ্লাইট ১৮ এপ্রিল রাত ১২টা ২০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। এতে ৪১৯ জন হজযাত্রী থাকবেন। সেদিন মোট ১৪টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। এর মধ্যে ৬টি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ৩টি সৌদিয়া এবং ৩টি ফ্লাইনাস পরিচালনা করবে। প্রাক-হজ ফ্লাইট চলবে ২১ মে পর্যন্ত। এ সময় মোট ২০৭টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। এর মধ্যে ১০২টি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ৭৫টি সৌদিয়া এবং ৩০টি ফ্লাইনাস পরিচালনা করবে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৮৫,৩০২ জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র হজ পালন করেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাকি যাত্রীরা সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। হজের কার্যক্রম শেষ করে জুন ২০২৫ নাগাদ তারা দেশে ফিরেছেন।
ওই বছর সৌদি আরবের মক্কায় হজ পালন করেছেন বিশ্বের ১৬ লাখের বেশি মুসলমান। বিশ্বের ১৭১টি দেশ থেকে হজ পালন করেছেন তারা। হজের জন্য নিবন্ধন করেছেন মোট ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ২৩০ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিবন্ধিত হাজি ছিলেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৪ জন এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হাজির সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ জন। পুরুষ হাজির সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৮৪১ জন। নারী হাজির সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮৯ জন। এই হাজিদের মধ্যে বিমানে সৌদি আরবে গমন করেছেন ১৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৭ জন। নৌপথে সৌদিতে গেছেন ৫ হাজার ৯৪ জন। মাইক্রো, কার ও এ জাতীয় পরিবহনে হজ করতে গেছেন ৬৬ হাজার ৪৬৫ জন হজযাত্রী।
অনুমতি ছাড়া হজ পালনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সৌদি আরব। হজ পারমিট ছাড়া হজের চেষ্টা করলে বা ভিজিট ভিসাধারীদের অবৈধভাবে হজে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ এক লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সৌদি আরবের সরকারি তথ্যমতে, আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই কড়াকড়ি বহাল থাকবে। মূল হজের সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে হজে অংশ নেওয়া এবং তাদের আবাসন বা যাতায়াতে যারা সাহায্য করবেন, উভয়পক্ষই এই শাস্তির আওতায় পড়বেন।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ পারমিট ছাড়া হজের চেষ্টা করেন, তবে তাকে ২০ হাজার সৌদি রিয়াল জরিমানার মুখে পড়তে হবে। একই সঙ্গে যেসব ভিজিট ভিসাধারী নিষিদ্ধ সময়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন বা অবস্থান করবেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই পরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে, আগামী ২৬ মে ২০২৬ পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হজ শেষে ফেরত ফ্লাইট ৩০ মে থেকে শুরু হয়ে ১ জুলাই পর্যন্ত চলবে।