ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ ও আনোয়ার হোসাইন সোহেল : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ১২ দিনে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এতে প্রভাব পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। সীমিত পরিসরে কিছু ফ্লাইট চললেও বিপুল অঙ্কের এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা। তবে কত টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান অ্যাভিয়েশন খাত-সংশ্লিষ্টরা। গতকাল বুধবারও মধ্যপ্রাচ্যগামী ২৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
বেবিচক সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আকাশপথ বন্ধের কারণে ঢাকা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১ মার্চ ৪০টি, ২ মার্চ ৪৬টি, ৩ মার্চ ৩৯টি, ৪ মার্চ ২৮টি, ৫ মার্চ ৩৬টি, ৬ মার্চ ৩৪টি, ৭ মার্চ ২৮টি, ৮ মার্চ ২৮টি, ৯ মার্চ৩৩টি এবং ১০ মার্চ ৩২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
এদিকে গতকাল বুধবার বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ছিলÑ কাতার এয়ারওয়েজের (কাতার) ৪টি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের (ইউএই) ৪টি, কুয়েত এয়ারের ২টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার (শারজাহ, ইউএই) ৪টি, গালফ এয়ারের (বাহরাইন) ২টি, জাজিরা এয়ারের (কুয়েত) ৪টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের (ইউএই) ৪টি। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বমোট বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা ৩৯১টি।
আর্থিক ক্ষতির মুখে দেশীয় এয়ারলাইন্স: ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিমান চলাচলের ওপরও। বাতিল হচ্ছে একের পর এক ফ্লাইট। হাজার হাজার যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এ কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স চলমান পরিস্থিতিকে তাদের ব্যবসার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছর শেষে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে পারে এয়ারলাইন্সগুলো।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এয়ারলাইন্সগুলো মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে পড়বে। আর এসব ক্ষতির এখনই সুনির্দিষ্ট হিসাব করা কঠিন হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়বে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা মু. কাওছার মাহমুদ শেয়ার বিজকে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়ছে। বাতিল হওয়া এসব ফ্লাইটের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সেরও অনেক ফ্লাইট রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে এবং অনিশ্চয়তা কাটার সম্ভাবনা কম।
বিমানের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে বিমানের মোট ২৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তীতে ৩ মার্চ থেকে আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই, দোহা, কুয়েত ও দাম্মাম রুটে সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই ছয় রুটের মধ্যে ঢাকা-আবুধাবি ও ঢাকা-শারজাহ রুটে সপ্তাহে পাঁচটি করে ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এর মধ্যে তিনটি সরাসরি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইট পরিচালিত হয় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের উড়োজাহাজ দিয়ে। ঢাকা-দুবাই রুটে বিমানের সাপ্তাহিক ফ্লাইট সংখ্যা সাতটি, যা পরিচালিত হয় বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে। অন্যদিকে ঢাকা-দোহা রুটে সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয় একই ধরনের ড্রিম লাইনার উড়োজাহাজে। ঢাকা-কুয়েত রুটে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান, যেখানে ব্যবহƒত হয় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ মডেলের উড়োজাহাজ। এছাড়া ঢাকা-দাম্মাম রুটে বিমানের সাপ্তাহিক শিডিউলড ফ্লাইট সংখ্যা ছয়টি, যা পরিচালিত হয় ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে নানা সুযোগ-সুবিধা পেলেও গত ৫৪ বছরে রুট বৈচিত্র্য আনতে পারেনি সংস্থাটি। এখনো অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের ওপরই নির্ভরশীল বিমান। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি এই আত্মনির্ভরতা সংস্থাটির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩৪ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে এবং কার্গো পরিবহন করেছে ৪৩ হাজার ৯১৮ টন। ওই অর্থবছরে সংস্থাটি ৯৩৭ কোটি টাকা অনিরীক্ষিত মুনাফা অর্জন করে। তবে বিমানের মুনাফার বড় একটি অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক ও হজযাত্রী পরিবহন থেকে। ফলে অঞ্চলটিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাধারণত রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার হাজার প্রবাসী দেশে ফেরেন। এ সময় প্রায় সব ফ্লাইট পূর্ণ থাকে এবং এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম এটি। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে সেই যাত্রী প্রবাহ প্রায় থমকে গেছে। ফলে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, যেখানে এখন ভালো ব্যবসা হওয়ার কথা সেখানে আমাদের একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। দ্রুত এ অবস্থা না কাটলে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় দেখা দিবে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশন) মো. কামরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন,
ফ্লাইট বাতিলের পর কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সেটি এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে ফ্লাইট বাতিলের পর কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে সীমিতভাবে ফ্লাইট চালু: অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও ধীরে ধীরে কিছু রুটে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ওমান ও সৌদি আরবগামী ফ্লাইটগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ওমানগামী ১টি ও সৌদি আরবের উদ্দেশে ৫টি বিমান বাংলাদেশ ছেড়ে যায়। ১ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৪টি ও সৌদির উদ্দেশে ১৬টি বিমান যায়, ২ মার্চ ওমানে ৫টি ও সৌদির উদ্দেশে ১৩টি বিমান যায় ঢাকা ছেড়ে। এছাড়া ৩ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৭টি ও সৌদির উদ্দেশে ১৫টি বিমান, ৪ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৮টি, সৌদির উদ্দেশে ২১টি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশে ৬টি বিমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যায়।
৫ মার্চ ওমানগামী ১০টি, সৌদি আরবের উদ্দেশে ২২টি ও আরব আমিরাতের উদ্দেশে ২টি বিমান যায়। ৬ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৬টি, সৌদির উদ্দেশে ১৫টি ও আরব আমিরাতের উদ্দেশে ১৩টি বিমান যায়। সবশেষ শনিবার (৭ মার্চ) ওমানের উদ্দেশে ৬টি, সৌদির উদ্দেশে ১৮টি ও আরব আমিরাতের উদ্দেশে ১৭টি বিমান ঢাকা ছেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর বহু ফ্লাইট বাতিল হলেও ওমান, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায় ২১৪টি ফ্লাইট।
এদিকে বৃহস্পতিবার ১৩ মার্চ থেকে শারজাহ ও আবুধাবি রুটে আবারও ফ্লাইট চালু করতে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এতে করে আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণের সুযোগ আরও বাড়বে। এয়ারলাইনসটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে শারজাহ রুটে প্রতি শুক্রবার, রোববার, মঙ্গলবার ও বুধবার ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও ধীরে ধীরে কিছু রুটে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হচ্ছে। বিশেষ করে ওমান ও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post