রোদেলা রহমান: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তি। বিশেষ করে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের জীবনধারা, পড়াশোনার অভ্যাস, মনোযোগ, চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে একজন শিক্ষার্থীর প্রধান সময় কাটত বই, খাতা, লাইব্রেরি কিংবা মাঠে, সেখানে এখন তাদের বড় একটি অংশ সময় কাটাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, মেসেঞ্জার কিংবা অনলাইন গেম ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তির এই বিস্তারকে একদিকে যেমন আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে নতুন সামাজিক ও শিক্ষাগত সংকট হিসেবেও দেখছেন। কারণ স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তা, মনোযোগ এবং জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে গভীরভাবে।
করোনাকালের পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের হার দ্রুত বেড়েছে। অনলাইন ক্লাস চালুর কারণে প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু শিক্ষার জন্য হাতে আসা এই প্রযুক্তি পরে বিনোদন ও আসক্তির বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে, ঘুমের সমস্যা বাড়ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের তুলনায় এখন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষে অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘসময় মনোযোগ দিতে পারে না। তারা দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়ে এবং ছোট ছোট ভিডিও বা দ্রুত বিনোদনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট থাকে। শিক্ষকদের মতে, টিকটক, শর্ট ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের ধৈর্য কমিয়ে দিচ্ছে।
অভিভাবকরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনেক পরিবারে এখন সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, কেউ গেম খেলছে, আবার কেউ অনলাইন ভিডিও দেখছে। ফলে ঘুম কমে যাচ্ছে, সকালে ক্লাসে মনোযোগ কমছে এবং পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগ, হতাশা, একাকিত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বাড়ছে অনেকের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে নিজেদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা থেকে মানসিক চাপও তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী এখন ভার্চুয়াল স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফেসবুকের লাইক, ভিডিওর ভিউ কিংবা অনলাইন জনপ্রিয়তাকে তারা বাস্তব সাফল্যের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলছে। ফলে বাস্তব জীবনের লক্ষ্য ও পরিশ্রমের জায়গায় দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ইউটিউব, অনলাইন কোর্স, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং ভার্চুয়াল ক্লাসরুম শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। আগে যেখানে ভালো শিক্ষকের অভাবে গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকত, এখন তারা অনলাইনে দেশের সেরা শিক্ষকদের ক্লাস দেখতে পারছে। বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ এবং প্ল্যাটফর্মও শিক্ষাকে সহজ করেছে।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি, চাকরির প্রস্তুতি এবং ভাষা শেখার ক্ষেত্রে অনলাইন শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক শিক্ষার্থী এখন ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক মানের কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সমস্যা মূলত ব্যবহারের ধরনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। অধিকাংশ পরিবার সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিলেও কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেয় না।
স্কুলগুলোতেও ডিজিটাল সচেতনতা শিক্ষা এখনো পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার্থীরা কীভাবে অনলাইন নিরাপত্তা বজায় রাখবে, ভুয়া তথ্য চিনবে, সাইবার বুলিং মোকাবিলা করবে কিংবা প্রযুক্তিকে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করবেÑএসব বিষয়ে কার্যকর শিক্ষা দেওয়া হয় না।
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের বড় একটি অংশ এখন অনলাইন প্রতারণা, সাইবার বুলিং এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী না বুঝেই ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করছে বা অনলাইনে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাসও কমে যাচ্ছে। ছোট ভিডিও ও দ্রুত বিনোদনের কারণে দীর্ঘসময় ধরে বই পড়া বা বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলাফল ও সৃজনশীলতার ওপরও পড়ছে।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও এখন দ্রুত স্মার্টফোনের বিস্তার ঘটছে। আগে যেখানে প্রযুক্তিগত বৈষম্যের কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে ছিল, এখন তারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছে। কিন্তু ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগের চেয়ে বিনোদনমূলক ব্যবহারের প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন সঠিক ব্যবহার শেখানো। পরিবার, স্কুল এবং রাষ্ট্রÑসবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশু ও কিশোরদের জন্য স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ, অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষা, ডিজিটাল লিটারেসি এবং বাস্তব সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন ডিজিটাল নাগরিকত্ব শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে প্রযুক্তি কীভাবে শেখার মাধ্যম হতে পারে, কীভাবে এটি দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।
একইসঙ্গে পরিবারগুলোতেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া নয়, বরং সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, বিকল্প বিনোদন এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী প্রজš§কে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। কারণ ভবিষ্যতের বিশ্ব হবে আরও বেশি ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে সেটিকে সঠিকভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রযুক্তি একইসঙ্গে সম্ভাবনা এবং সংকটের নাম। সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। অন্যথায় এটি মনোযোগহীন, মানসিকভাবে দুর্বল এবং বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রজš§ তৈরি করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
