সাখাওয়াত সাব্বির, চট্টগ্রাম: নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। চারদিকে পাঁচ শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, গেটে আধুনিক স্ক্যানার, অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং সফটওয়্যার আর ‘আইএসপিএস’ কোডের কঠোর নিরাপত্তা পরিকাঠামো। কিন্তু এই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই রাতের আঁধারে গায়েব হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কোটি টাকার কনটেইনার! আর এই অবিশ্বাস্য চুরির মহোৎসবের পেছনে বাইরে থেকে আসা কোনো সিঁধেল চোর নয়, কাজ করছে বন্দরের ভেতরেই শিকড় গেড়ে বসা এক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত ‘সিন্ডিকেট’।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তর থেকে কোটি টাকার কাপড় বোঝাই কনটেইনার পাচারের ঘটনায় দুই ক্ষমতাধর কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে বন্দর থানা পুলিশ। বুধবার অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমান ও আবু সুফিয়ান নামের ওই দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে উচ্চমান বহিঃসহকারী হিসেবে কর্মরত। আর আবু সুফিয়ান বন্দরের কিপ ডাউন এসসি-১৮৮ পদে কর্মরত। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছর ধরে একের পর এক কনটেইনার চুরি ও পাচারের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রবন্দরের ভেতরে কাজ করছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। যারা বন্দরের নিজস্ব লোকজনকে ব্যবহার করে, ডিজিটাল সিস্টেম ফাঁকি ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে কনটেইনার বের করে দিচ্ছে।
?পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২ এপ্রিলের মধ্যে চীন থেকে আমদানিকৃত গার্মেন্টসের কাপড় বোঝাই একটি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে চুরি হয়। পরে এ ঘটনায় বন্দর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পাচার হওয়া কনটেইনারটি গাজীপুরের মোয়াজউদ্দিন টেক্সটাইল লিমিটেড আমদানি করেছিল। টিসিএলইউ৮৫৫৭৩০৪ নম্বরের ৪০ ফুট কনটেইনারটিতে কয়েক কোটি টাকার কাপড় ছিল বলে জানা গেছে। কনটেইনারটি বন্দরে পৌঁছানোর পর বার্থ অপারেটর বশির আহাম্মদের মাধ্যমে জাহাজ থেকে খালাস করা হয় এবং পরে বন্দরের জে আর ইয়ার্ডে রাখা হয়। পরবর্তীতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এস জামান অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেড শুল্ককর পরিশোধ করে কনটেইনারটি ডেলিভারি নিতে গেলে দেখা যায়, ইয়ার্ডে কনটেইনারটির কোনো অস্তিত্বই নেই। শুল্ক দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাল নেই।
?বন্দর থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিম জানান, ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করতে গিয়ে বন্দরের দুই কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর বুধবার তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। কনটেইনার পাচারের ঘটনায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি নাÑতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চাঞ্চল্যকর এ কনটেইনার পাচার ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি প্রশিক্ষণের জন্য ছুটিতে আছি। অনুগ্রহ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিপিও নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বর্তমানে তিনিই বিষয়টি দেখছেন।
তার পরামর্শ অনুযায়ী যোগাযোগ করা হলে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও এই মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি সিপিও নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ একে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এটা এখন বিচারাধীন বিষয়। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেহেতু তদন্ত চলছে, তাই এখন এই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কোনো কথা বলা যাবে না।
এ ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসেই বন্দরের এনসিটি ব্যাকআপ ইয়ার্ড থেকে আরেকটি ৪০ ফুটের কনটেইনার পাচারের চেষ্টা হয়েছিল। পাচারকারীরা ভুয়া নথিপত্র, জাল শিপিং চালান এবং নকল গেট পাস ব্যবহার করে সুরক্ষিত এলাকা থেকে কনটেইনারটি বের করার চেষ্টা করে। তবে সেবার তার ব্যর্থ হয়, পরে বন্দর ও হালিশহর এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে কনটেইনারটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় স্পষ্ট যে, একই পদ্ধতিতে বারবার চেষ্টা চলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বন্দরের ভেতরের লোকজনের যোগসাজশ ছিল বলে তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা বন্দরে তাদের নিজস্ব পদমর্যাদার সুবিধা নিয়ে সফটওয়্যারে কনটেইনারের ডিজিটাল এন্ট্রি পরিবর্তন করে এবং ইয়ার্ডের লোকেশন বদলে দেয়। ফলে সিসিটিভি ও নিরাপত্তা প্রহরী কনটেইনারটিকে আর শনাক্ত করতে পারে না।
২০২৩ সালের ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ড থেকে কোনো প্রকার ডকুমেন্ট ছাড়াই দুটি পণ্যভর্তি কনটেইনার বন্দরের বাইরে চলে যায়, তৃতীয়টি বের করার সময়ই ধরা পড়ে। ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন তোলে, কারণ সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ডে মূলত বন্দরের নিলামযোগ্য কনটেইনার রাখা হয়, নিলাম শেষে সেখান থেকে ডেলিভারি দেওয়া হয়। এই ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করে, আরও ১০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পরে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পাচার হওয়া কনটেইনার দুটি উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছিলেন বন্দর পরিবহন বিভাগের নিম্নমান বহিঃসহকারী মো. আব্দুল হাকিম, বন্দরের নিরাপত্তারক্ষী কাজী আবু দাউদসহ বেশ কয়েকজন। অর্থাৎ পরিবহন বিভাগ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বিভাগ পর্যন্ত চক্রটি বন্দরের একাধিক শাখায় শিকড় গেড়েছিল।
এ ঘটনার পরপরই তদন্তে উঠে আসে আরও গভীর চিত্র। চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা, পরিবহন, আনসারসহ কনটেইনার খালাসের সঙ্গে জড়িত অপারেটর কর্মচারীদের যোগসাজশে বন্দরে একটি শক্তিশালী পাচারচক্র গড়ে উঠেছে। এরা নানা কায়দায় জাল কাগজপত্র তৈরি করে বন্দরের ভেতর থেকেই পণ্যভর্তি কনটেইনার পাচার করে আসছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ইতিপূর্বে মদভর্তি কনটেইনার পাচারের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া বন্দরের নিরাপত্তারক্ষী মোজাম্মেল হোসেন রবিন ছিলেন এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদাতা। একজন বরখাস্তপ্রাপ্ত কর্মচারী সিন্ডিকেটের মাথাÑএই তথ্যটি বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কতটা গলদ রয়েছে তা স্পষ্ট করে দেয়।
বন্দরসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) থেকে শুল্ক না দিয়ে জাল কাগজপত্র বানিয়ে কনটেইনার বের করে নেওয়ার ঘটনা অতীতে বহুবার ঘটেছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক এমন একটি ঘটনায় মধ্যরাতে লরিতে করে কনটেইনার (নম্বর: সিএএইউ৮৭৮৮৯৬৩) বের করার চেষ্টা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেন, পরস্পর যোগসাজশে জাল কাগজপত্র তৈরি করে প্রতারণার মাধ্যমে কনটেইনারটি খালাস করার চেষ্টা হয়েছিল, যদিও কাস্টমস তখনও শুল্কায়ন করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বন্দরে পাঁচ শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, কনটেইনার ট্র্যাকিং সফটওয়্যার, আইএসপিএস কোড অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিকাঠামো থাকার পরও কীভাবে বারবার একই কায়দায় কনটেইনার পাচার হচ্ছে? একাধিক তদন্ত ও সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই সিন্ডিকেটের কার্যপদ্ধতির একটি ধারাবাহিক ছবি পাওয়া যায়।
চক্রের সদস্যরা প্রথমে বন্দরে আসা আমদানি কনটেইনারের মধ্যে দামি পণ্যবোঝাই কনটেইনার চিহ্নিত করে। এক্ষেত্রে বন্দরের ভেতরে কর্মরত সিন্ডিকেট সদস্যরা তথ্য সরবরাহ করেন। এরপর বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে কনটেইনারের লোকেশন পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। ফলে ইয়ার্ডে সেটি থাকলেও ট্র্যাকিং সিস্টেমে ভিন্ন জায়গায় দেখায়। তারপর জাল গেট পাস, নকল ডেলিভারি অর্ডার এবং ভুয়া শুল্ক পরিশোধের নথি তৈরি করে বন্দরের গেট পার করার জন্য যেসব গেটে সিন্ডিকেটের লোক থাকেন সেই পথ ব্যবহার করা হয়। সর্বশেষ গ্যারেজ বা সুবিধামতো স্থানে কনটেইনার রেখে পণ্য বের করার পর কনটেইনার লুকিয়ে ফেলা হয়।
ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই সমস্যার সমাধান শুধু গ্রেপ্তারে হবে না। প্রয়োজন বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল লগইন নজরদারি জোরদার, প্রতিটি গেটে স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থা চালু এবং কনটেইনার লোকেশন পরিবর্তনে একাধিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা।
বন্দর থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিম জানিয়েছেন, পাচার হওয়া কনটেইনার উদ্ধারে অভিযান চলছে এবং সহযোগীদের শনাক্তে কাজ চলছে। গ্রেপ্তার দুজনের জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই পাচার ঘটনা একটি সত্য উšে§াচন করে দিচ্ছেÑচট্টগ্রাম বন্দরের দেয়াল, তালা ও ক্যামেরার আড়ালেই আছে সবচেয়ে বড় ফাঁক। আর সেই ফাঁক দিয়ে রাতের আঁধারে বের হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার কনটেইনার।
