শেয়ার বিজ ডেস্ক: দেশের বন্দরগুলোতে আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অবৈধ বিদেশি সিগারেটের প্রবেশ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত স্ক্যানার ও উন্নত প্রযুক্তির অভাবে চোরাকারবারিরা সহজেই বিভিন্ন কৌশলে বিদেশি সিগারেট দেশে প্রবেশ করাচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশের বাজারে বিস্তৃত হচ্ছে অবৈধ সিগারেটের নেটওয়ার্ক।
চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ততম এলাকা নিউমার্কেট সংলগ্ন রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় প্রতিদিন ফেরি করে পান-সিগারেট বিক্রি করেন সাইদুল মিয়া (ছদ্মনাম)। তার ছোট কাঠের বাক্সে দেশি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি দেখা যায় ওরিস, মন্ডসহ বিভিন্ন বিদেশি সিগারেট। নগরীর বিভিন্ন মোড় ও জনবহুল এলাকাতেও একইভাবে বিদেশি সিগারেট বিক্রি করতে দেখা যায় অনেককে।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে দেশে আসা এসব বিদেশি সিগারেট তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম কাস্টমস, বিমানবন্দর ও সীমান্তপথ দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশে প্রবেশ করছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস নিয়মিত তদারকি করছে এবং অবৈধ পণ্য প্রবেশে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তার দাবি, স্ক্যানিং ছাড়া কোনো পণ্য ছাড় করা হয় না এবং সন্দেহজনক চালানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের বন্দরগুলোতে পর্যাপ্ত স্ক্যানিং মেশিন নেই, যেগুলো রয়েছে তার অনেকগুলো পুরোনো প্রযুক্তির এবং অনেক সময় অচল থাকে। ফলে কনটেইনার স্ক্যানিংয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে দেশের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে ২৮ লাখ ২০ হাজার শলাকা অবৈধ সিগারেট জব্দ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সম্প্রতি বিদেশি সিগারেটের বড় বড় চালান জব্দের পর নজরদারি জোরদার করা হলেও এখনও অনেক চালান ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও সমুদ্রবন্দর এবং সীমান্তপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের বিদেশি সিগারেট দেশে প্রবেশ করছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, টেকনাফ ও বান্দরবনের সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে এসব সিগারেট আনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ পণ্যের আড়ালে ভুয়া ঘোষণাপত্র ব্যবহার করেও সিগারেট আনা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চোরাচালান ঠেকাতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্যানিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা তাদের বন্দরে উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি ও ডিজিটাল কনটেইনার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর-এর তুয়াস মেগা পোর্ট-এ অত্যাধুনিক রেডিওগ্রাফিক স্ক্যানিং পোর্টাল, মোবাইল স্ক্যানিং ইউনিট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইমেজ অ্যানালাইসিস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কনটেইনারের ভেতরে লুকানো পণ্য সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, বন্দরে স্ক্যানারের কভারেজ দ্রুত বাড়ানো জরুরি। তার মতে, পর্যাপ্ত স্ক্যানার ও কার্যকর মনিটরিং না থাকায় পণ্য ছাড়ে দেরি হচ্ছে এবং অবৈধ পণ্য শনাক্তে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস হাউস-এর যুগ্ম কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে আসা অবৈধ সিগারেট জব্দে কাস্টমস অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও ফ্লাইটগুলো বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র অভিযান চালিয়ে অবৈধ সিগারেট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত স্ক্যানার, দক্ষ জনবল ও ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
