দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশে একসময় বছরে একটি ফসল হতো। তারপর সারাবছর জমিগুলো থাকত পতিত। একসময় ওই অঞ্চলে শুধু আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে চাষাবাদ হতো, অগ্রহায়ণ মাসে ফসল উঠত কৃষকের ঘরে, তা-ও ফলনে কম। সে সময় কৃষিজীবী মানুষ কোনো রকমে বছর পার করত, আবার পরের বছরের ফসলের জন্য অপেক্ষা করত। অভাব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। এই অঞ্চলটির নাম বরেন্দ্র অঞ্চল। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের আরও কিছু জেলা-উপজেলা নিয়ে এই অঞ্চলটি বিস্তৃত্ব। এই অঞ্চলের উর্বরতাকে ব্যবহার করতে আশির দশকে নেওয়া একটি বৃহৎ প্রকল্প। নাম দেওয়া হয় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। গভীর নলকূপ স্থাপন করে এই এলাকার সর্বত্রই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। সেই থেকে পানি উত্তোলন আজও অব্যাহত। সেই পানিতে এখন বরেন্দ্র অঞ্চলে বারোমাস ফসল ফলে বটে কিন্তু অব্যাহত উত্তোলনে পানির স্তর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নিচে নেমে গিয়ে বিপর্যয় ডেকে আনছে।
দৈনিক শেয়ার বিজে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, ‘বরেন্দ্র অঞ্চল, যা একসময় উত্তরাঞ্চলের শস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত ছিল, আজ ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ পানিশূন্য ভূখণ্ডে পরিণত হচ্ছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ জেলাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরের পর বছর ধরে নেমে যাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে।’ সংবাদটি খুবই উদ্বেগজনক। এভাবে যদি পানির স্তর নিচে নেমে যায়, তাহলে এই অঞ্চলের কৃষি-পরিকল্পনা একবারে থমকে যাবে। এ অঞ্চলের জীবন-জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়বে।
সংবাদ ভাষ্য মতে, বরেন্দ্র এলাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁর অংশ নিয়ে গঠিত। ভূতাত্ত্বিকভাবে একটি উঁচু ভূমি এলাকা। এখানকার মাটি কাদামাটির মতো, পানি শোষণ করে কম। ১৯৬০-এর দশক থেকে কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে গভীর নলকূপ স্থাপন শুরু হয় এ এলাকায়। ১৯৮০-এর দশক থেকে এই কাজে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ফলে বোরো ধানের উৎপাদন বেড়েছে।
সংবাদের আরেক অংশে উল্লেখ করা হয়, সরকারি এ সংস্থাটির অধীনে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বর্তমানে ১৫ হাজার ৮৪২টি গভীর নলকূপ রয়েছে; যার প্রায় ১৫ হাজারটিই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে ব্যবহƒত হচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানায় হাজার হাজার সেমিডিপ এবং অগভীর নলকূপ রয়েছে; যা কোনো দীর্ঘমেয়াদি জলসম্পদ পরিকল্পনা ছাড়াই স্থাপিত হয়েছে। এখানে প্রতীয়মান হয়, এ অঞ্চলে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা অনেকটা অপরিণামদর্শী। দূরদর্শী পরিকল্পনা থাকলে এখন এই সংকট তৈরি হতো না। এ অঞ্চলের পার্শ্ব ঘেঁষে প্রবাহিত দেশের বৃহৎ নদী পদ্মা। এই নদী থেকে পানি উত্তোলন করতে একবার প্রকল্প নেওয়ার কথা উঠেছিল। কিন্তু এখন বিষয়টি কী পর্যায়ে, তা আর আলোচনায় নেই।
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট এখন আর কেবল পরিবেশগত নয়, এটি অর্থনৈতিক এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। যদি কঠোর নীতি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হয়, তাহলে এ অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে। সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য এই সম্পদ সুরক্ষিত হয়। আমরা মনে করি, বরেন্দ্র অঞ্চলকে বাঁচাতে পদ্মা নদীভিত্তিক প্রকল্পের কথা ভাবতে হবে। এ নদীভিত্তিক পানি উত্তোলন ব্যবস্থা কিছুটা হলেও বিকল্প হতে পারে এই সংকটের।
