শাহীনুর আলম : বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের চিত্র এখন পরস্পরবিরোধী দুই বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে, যা আঞ্চলিক মানদণ্ডে খুব বেশি নয়। অন্যদিকে বিভিন্ন জরিপ ও পত্রপত্রিকার খবর বলছে, কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংকট বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে, যা আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের সংখ্যার ভেতরে পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ২০২৪ সালে বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৬২৭ লক্ষ, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই জরিপে দেখা যায়, শহরে বেকারত্বের হার গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি; শহরে প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, গ্রামে ৩ দশমিক ৪ শতাংশের মতো, যা দেখায় নগরকেন্দ্রিক স্ন্নাতক ও সেবা খাতনির্ভর অর্থনীতিতে চাপ বেশি পড়ছে। আবার বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূত্রে দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে ৪ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে বেশি এবং ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে।
এই সামগ্রিক ছবির ভেতরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশটি হলো যুবসমাজের বেকারত্ব। বিএসএস-এর ২০২৩ সালের শ্রমবাজার জরিপে দেখা গেছে, ১৫২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তির মধ্যে বেকারত্বের হার ৭.২ শতাংশ, সংখ্যায় যা প্রায় ১৯ লাখ তরুণ-তরুণী। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৯ শতাংশই যুবক-যুবতী, অর্থাৎ দেশের বেকারত্ব আসলে মূলত তরুণদের বেকারত্বেরই প্রতিচ্ছবি।
শিক্ষিত তরুণদের অবস্থাও কম সংকটাপন্ন নয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে; কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখের মতো। বিএসএসের তথ্য অনুসারে, বেকার যুবকদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের উচ্চশিক্ষা ডিগ্রি আছে, অর্থাৎ যারা সনাতনী ধারণা অনুযায়ী ‘চাকরির সবচেয়ে যোগ্য’, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি বেকার। এতে বোঝা যায়, শিক্ষার বিস্তার কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এনে দিতে পারেনি; বরং দক্ষতা-বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার অমিল আরও নগ্ন হয়েছে।
বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে আন্দোলন অস্থিরতা, সরকার পরিবর্তন, নীতি পুনর্বিন্যাস সব মিলিয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চাকরির বাজারে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে ২০ লক্ষের বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে বা তৈরি হওয়ার আগেই আটকে গেছে, আর সামনে আরও কিছুটা পতনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন উন্নয়ন সংস্থার বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে বেসরকারি খাত যা বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের মূল ভরকেন্দ্র সেখানে নতুন নিয়োগ প্রায় থমকে গেছে। একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অল্প সময়ের জন্য অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন কিছুটা বাড়লেও পরবর্তী মাসগুলোতে অনিশ্চয়তার কারণে নিয়োগবাজার আবার নিম্নগামী হয়েছে। ব্যাংক খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে ধীরগতি, নির্মাণ ও শিল্পখাতে প্রকল্প স্থগিত থাকা সবকিছু মিলিয়ে বেসরকারি খাতের বহুমুখী সংকোচন নতুন চাকরি সৃষ্টিকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নারীর কর্মসংস্থান সংকটও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত ২১ লক্ষ চাকরি হারিয়েছে, এর মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি নারী কর্মী এমন হিসাব তুলে ধরে সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ। তরুণ নারীদের বড় একটি অংশ ‘নিট’ বা শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ কোনো ক্ষেত্রেই নেই; অর্থাৎ দেশের জনমিতিক লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই ঘটাচ্ছে না, সামাজিক বৈষম্য ও নির্ভরশীলতাও বাড়াচ্ছে।
সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো ‘অদৃশ্য’ বা আংশিক বেকারত্ব, যা সরকারি পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। বিএসএসের শ্রমশক্তি জরিপে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষ অপরিশোধিত গৃহস্থালি ও পারিবারিক কাজে যুক্ত, যাদের বড় অংশই নারী ও কিশোরী। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিশাল কর্মীসমষ্টি যাদের সংখ্যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ; এদের আয় অনিশ্চিত, নিরাপত্তাহীন এবং সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই তারা কার্যত বেকারত্বের কাতারে পড়ে যান।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থানকে ঘিরে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে নীতি-অস্থিরতা ও আস্থাহীনতা। যে কোনো সরকার পরিবর্তনের পর স্বাভাবিকভাবে কিছু নীতি পুনর্বিন্যাস হয়, কিন্তু যখন তা দীর্ঘসূত্রতা আর অস্পষ্টতার ফাঁদে আটকে যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা ‘অপেক্ষা ও দেখো’ অবস্থানে চলে যান, নতুন কারখানা, নতুন প্রকল্প, নতুন শাখা সবকিছু স্থগিত রাখেন। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু পরিসংখ্যান হয়তো খুব খারাপ দেখায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়, যা আবারও বেকার তরুণদের হতাশাকে আরও তীব্র করে তোলে।
এ অবস্থায় শুধু বেকারত্বের হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মসংস্থানের মান, স্থায়িত্ব ও অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে ভাবা। বিশ্বব্যাংক, বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও জাতীয় পত্র-পত্রিকার বিশ্লেষণে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, স্নাতক, তরুণ, নারী ও গ্রামীণ শ্রমশক্তির জন্য আলাদা লক্ষ্যধর্মী নীতি উদ্যোগ ছাড়া বেকারত্বের প্রকৃত সংকট সমাধান সম্ভব নয়। একইসঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতের দক্ষতার চাহিদার সেতুবন্ধন, স্টার্টআপ ও উদ্যোগী যুবকদের জন্য সহজ ঋণ ও প্রণোদনা, এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিকতার আওতায় আনার মতো কাঠামোগত সংস্কার না আনলে সংখ্যার খাতায় কর্মসংস্থান বাড়লেও বাস্তবে হতাশা ও অনিশ্চয়তা কমবে না।
অতএব, বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক সূচকের আলোচ্য নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে বিপুল তরুণ জনসংখ্যাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বলা হচ্ছে, তাদের মধ্যে বড় অংশ যদি শিক্ষিত হয়েও বেকার থাকে, তবে সেই জনসংখ্যা অদূর ভবিষ্যতে সম্পদ থেকে বোঝায় পরিণত হবে এ হুঁশিয়ারি ইতোমধ্যে বিভিন্ন নীতি-অধ্যয়নে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য এখন জরুরি দায়িত্ব হলো সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বাস্তব ছবিকে স্বীকার করা, এবং স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সংকটকে অবহেলা না করে পরিকল্পিত, সাহসী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া।
লেখক: সংসবাদকর্মী
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post