নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: বর্তমান সমাজে শিশুকে বড় করে তোলা শুধু একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি জটিল সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, ব্যস্ততা, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সামাজিক চাপ-সব মিলিয়ে আজকের বাবা-মায়েরা, বিশেষ করে মায়েরা, এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এই বাস্তবতাকেই অত্যন্ত সহজ, সংবেদনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী ভাষায় তুলে ধরেছেন শ্যামল আতিক তাঁর ‘শিশু লালনে বর্তমান মায়েদের চ্যালেঞ্জ’ লেখায়। শেয়ার বিজের ঈদসংখ্যা-২০২৬ এর ৮১ নম্বর পৃষ্ঠায় এই লেখাটা পড়ে অনেক কিছু জানা যাবে।
লেখাটি পড়লে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর বাস্তবতার গভীরতা। লেখক কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা বা কৃত্রিম উপদেশের পথে হাঁটেননি; বরং প্রতিদিনের জীবনের পরিচিত দৃশ্যগুলোকে সামনে এনেছেন। একসময় যৌথ পরিবারে শিশু বড় হওয়ার যে পরিবেশ ছিল—দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সান্নিধ্য—আজ তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে সন্তান লালনের প্রায় পুরো দায়িত্ব এখন বাবা-মায়ের, বিশেষ করে মায়ের কাঁধে এসে পড়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ ও আবেগীয় সংযোগের জায়গায়ও পরিবর্তন এসেছে—লেখক সেটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
বর্তমান সময়ের কর্মজীবী মায়েদের বাস্তবতা লেখাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংসার, চাকরি, সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছু সামলে সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা যে কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে, তা লেখক স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। তবে লেখাটির সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মায়েদের ব্যর্থতা হিসেবে বিষয়টিকে দেখেনি। বরং আধুনিক জীবনের চাপ ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে এনে সমস্যার গভীরতা বোঝানোর চেষ্টা করেছে। ফলে লেখাটি কোনো অভিযোগের ভাষা হয়ে ওঠেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছে উপলব্ধির একটি আয়না।
লেখক শিশুর মানসিক বিকাশে ছোট ছোট পারিবারিক অভ্যাসের গুরুত্বও অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প বলা, শিশুর সঙ্গে খেলাধুলা করা কিংবা তার কথা মন দিয়ে শোনা—এসব সাধারণ বিষয়কেই তিনি শিশুর আবেগীয় বিকাশের বড় উপাদান হিসেবে দেখিয়েছেন। বর্তমানে অনেক পরিবারে শিশুর সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে প্রযুক্তিকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা টেলিভিশন শিশুদের নীরব রাখলেও তাদের ভেতরের জগৎকে ধীরে ধীরে একাকী করে তুলছে—এই বার্তাটি লেখক অত্যন্ত সংযত অথচ শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করেছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো প্রযুক্তিনির্ভরতার প্রসঙ্গটি। আজকের শিশুরা বাস্তব মাঠের চেয়ে ভার্চ্যুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। পরিবারও অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছে। লেখক দেখিয়েছেন, এতে শিশুর মনোযোগ, আচরণ ও সামাজিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে তিনি আতঙ্ক তৈরি করেননি; বরং সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার কথা না বলে, তিনি পারিবারিক সংযোগ ও মানবিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
লেখাটির ভাষা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল এবং পাঠকবান্ধব। কোনো জটিল শব্দ বা অতিরিক্ত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছাড়াই লেখক গভীর একটি সামাজিক সমস্যাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে সাধারণ পাঠকও সহজেই বিষয়গুলোর সঙ্গে নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারেন। একজন মা, বাবা কিংবা পরিবারের সদস্য—যেই পড়ুন না কেন, লেখাটি তাঁদের ভাবতে বাধ্য করবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লেখাটিতে সমাধানের ইঙ্গিত রয়েছে। লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন, শিশুকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানো বা প্রযুক্তিগত সুবিধা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তার মানসিক নিরাপত্তা, আবেগীয় সংযোগ এবং পরিবারের উষ্ণ উপস্থিতিও সমান জরুরি। শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো, তার কথা শোনা, তাকে গুরুত্ব দেওয়া—এসবই একটি সুস্থ মানসিকতার মানুষ গড়ে তোলার ভিত্তি।
সব মিলিয়ে ‘শিশু লালনে বর্তমান মায়েদের চ্যালেঞ্জ’ শুধু একটি পারিবারিক বিষয়ভিত্তিক লেখা নয়; এটি বর্তমান সমাজ ও পরিবারের পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি মানবিক দলিল। শ্যামল আতিক অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন। পরিবার, সন্তান এবং মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায় এই লেখা। বর্তমান সময়ের অভিভাবকদের জন্য এটি যেমন সচেতনতার বার্তা, তেমনি সমাজের জন্যও একটি প্রয়োজনীয় আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি করে।
এই ম্যাগাজিনটি পড়ে প্রশংসা করেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তাদের মতে শেয়ার বিজের এই ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক।
