শাহাজাদা ইসলাম শায়খ : সারাবিশ্বে চলচ্চিত্র এখন কেবল বিনোদন নয়, এটি অর্থনীতির সঙ্গে একেবারে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত হয়ে রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে আমরা এ বিষয়টি একেবারে উপলব্ধিই করি না। পাশের দেশ ভারতের অর্থনীতিতে চলচ্চিত্রের অবদান অনেক। সেখানকার মানুষ ক্রিকেট ও চলচ্চিত্র ছাড়া কিছু বোঝে না। আমরা এত কাছে থেকেও এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারলাম না।
আমাদেরও চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির আবর্ত তৈরি করার সুযোগ ছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্র যে গুণগত অবস্থানে পৌঁছেছিল, তা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। বরং আরও বহুগুণে পিছিয়ে গেছি। চলচ্চিত্রের গান তখন মানুষের মুখে মুখে থাকত। এখন যেমনটা ভারতে দেখা যায়। সিনেমা রিলিজ হওয়ার আগেই গান ভাইরাল। কখনও কখনও শোনা যায় গান বিক্রি করেই সিনেমার টাকা তুলে ফেলেছেন প্রযোজক। আমরা সেদিক দিয়ে এখনও যোজন যোজন দূরে রয়েছি। এ কারণেই ভারতের সিনেমার গান না বাজলে বাংলাদেশে বিয়েই হয় না।
যা হোক, আমরা তরুণ চলচ্চিত্রকাররা এখনও আশায় বুক বেঁধে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চেষ্টা করছি। কারণ দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে বর্তমান সরকার অনেক আশাবাদী। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে ৫ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের দৃষ্টিতে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে সাংস্কৃতিক রপ্তানি সুপারপাওয়ার হওয়ার মহাযাত্রা শুরু হতে চলেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কে-কালচার বা আমেরিকার হলিউডের মতো বৈশ্বিক আধিপত্য অর্জনের এই ভিশনের ভিত্তি হলো প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনের দিকে পূর্ণ মনোযোগী হওয়া; যা বাংলাদেশকে এআই-শাসিত বিশ্ব চলচ্চিত্র আসরে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের রূপান্তরের এই প্রত্যাশার পেছনে রয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিশন। বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি বাংলাভাষী ডায়াসপোরা এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ তরুণ দর্শকগোষ্ঠী এই শিল্পের জন্য এক অস্পর্শিত বাজার তৈরি করে রেখেছে। চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৮টি সহযোগী শিল্পকে পোশাক, সাহিত্য, সংগীত, প্রযুক্তি একই ছাতার নিচে এনে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যা দেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ আয়) বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই হবে—এই শিল্পের দ্রুততম রাজস্ব ইঞ্জিন। দেশের সৃজনশীল খাতকে একটি সুসংগঠিত ফ্রিল্যান্সিং পাওয়ার হাউসে পরিণত করা অপরিহার্য। প্রোডাকশন হাব, ব্যাকস্টেজ, আপওয়ার্ক, ফাইভার, পিপল পার আওয়ারসহ সব ক্রিয়েটিভ ফ্রিল্যান্সিং সাইটগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। বিশেষত ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স), মোশন গ্রাফিক্স, কালার গ্রেডিং, সাউন্ড ডিজাইন, স্ক্রিপ্ট রাইটিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এবং ভার্চুয়াল আর্ট ডিরেকশন এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্র্যাকটিক্যাল ও হাতে-কলমে শিক্ষাভিত্তিক বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। এই সৃজনশীল কর্মীদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ক্রিয়েটিভ এডুকেশন স্ক্যামিং দূর করতে একটি জাতীয় মান নিয়ন্¿ণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া স্থাপন করা হবে, যেখানে প্রশিক্ষণের মান সরাসরি আন্তর্জাতিক কাজের বাজারের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সিনেমার মূল শক্তি হতে হবে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিল্প সাহিত্য ও লোককথা। কেবল বাণিজ্যিক ফর্মুলা নয়, বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী গল্প, দেশীয় লোকজ ঐতিহ্য এবং জীবন্ত কালচারাল ন্যারেটিভগুলোকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিশ্বদরবারে স্বাতন্¿্য নিয়ে পৌঁছাতে পারবে। এই প্রক্রিয়ায় সিনেমার ভাষায়ও আমূল পরিবর্তন আসবে; তা আরও আন্তর্জাতিক, সাবলীল এবং বৈশ্বিক দর্শকদের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার উপযোগী হবে। আঞ্চলিক ও স্থানীয় ভাষার বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়েও একটি গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করতে হবে, যা দেশের ব্র্যান্ডিং ও পর্যটনশিল্পকেও চাঙা করবে। প্রতিটি ফিল্ম প্রোডাকশনে দেশীয় শিল্পী ও কারিগরদের কাজকে আন্তর্জাতিক মানের করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিময় কর্মসূচি চালু করতে হবে।
সিনেমাশিল্পের রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রদর্শনী অবকাঠামোর অভাব এবং রাজস্বের অস্বচ্ছতা। এই বাধা অতিক্রম করতে সারাদেশে ন্যূনতম ৫ হাজার আধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা জরুরি। এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বয়ে একটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে পরিচালনা করতে হবে। সরকার একটি ‘সিনেমা অবকাঠামো ফান্ড’ তৈরি করবে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, ১ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করা হবে, যার সরকারি গ্যারান্টি থাকবে। রাজস্ব আদায়ে ১০০ শতাংশ ই-টিকেটিং ব্যবস্থা অবিলম্বে বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি দেশের টেলিভিশন শিল্পকেও পে-চ্যানেল মডেলে দ্রুত রূপান্তর করতে হবে। প্রিমিয়াম কন্টেন্টগুলো পে-চ্যানেল বা শক্তিশালী ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে। এটি পার্শ্ববর্তী দেশের বলিউড রাজস্ব মডেলের মতো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করবে।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে গ্লোবাল ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করবে, তার একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে দেশে ভিএফএক্স এবং পোস্ট-প্রোডাকশন ল্যাব স্থাপন করতে হবে। এই ল্যাবগুলো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের আউটসোর্সিং কাজও বাংলাদেশে আনতে সক্ষম হবে। এআই ডেটা বিশ্লেষণ করে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি এবং বিপণন কৌশল নির্ধারণে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে কনটেন্টের কপিরাইট ও রয়্যালটি বিতরণের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটির (এআর) মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে দর্শকদের জন্য আরও নিমগ্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে মেটাভার্সের মতো নতুন প্ল্যাটফর্মে বাংলা কন্টেন্ট বিক্রির পথ তৈরি করতে হবে। আগামীতে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যে এজ কম্পিউটিং এবং কোয়ান্টাম ফিল্মিং প্রযুক্তি আসছে, সে বিষয়ে দেশীয় নির্মাতাদের গবেষণার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, যাতে তারা বিশ্ব থেকে পিছিয়ে না পড়ে।
এই রূপান্তরের জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার অবশ্যই রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা ও সৃজনশীলতার ভিত্তিতে যোগ্য নেতৃত্বের হাতে তুলে দিতে হবে। একটি স্বাধীন ‘বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ বোর্ড’ গঠন করতে হবে। এই বোর্ডের নেতৃত্বে থাকবেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অস্কার-বিজয়ী মানের নির্মাতা, অভিজ্ঞ প্রযোজক, শিল্প-অর্থনীতিবিদ এবং বিজনেস জার্নালিস্টরা। এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক লবিং বা রেফারেন্সের সুযোগ থাকবে না। তাদের প্রধান কাজ হবে মানসম্মত সিনেমা তৈরি এবং ‘অস্কার স্ট্র্যাটেজি টিম’ গঠন করে নিয়মিতভাবে কান, ভেনিস ও অস্কারের মতো আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এই টেকনোক্র্যাট নেতৃত্ব দ্রুত পার্শ্ববর্তী দেশ এবং হলিউডের সঙ্গে অডিও-ভিজ্যুয়াল কো-প্রোডাকশন চুক্তি স্বাক্ষর করবেন, যা বাংলাদেশের নির্মাতাদের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের আন্তর্জাতিক দরজা খুলে দেবে। একটি ‘সাংস্কৃতিক রপ্তানি সেল’ তৈরি করতে হবে, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় ডাবিং করে আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র রপ্তানি নিশ্চিত করবে।
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, ক্রিকেট ও রেমিট্যান্সের পাশাপাশি চলচ্চিত্রই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত, এবং বিশ্বজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও মেধার এক অস্কার-বিজয়ী স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা পাবে। সংস্কৃতি ও শিল্পকে অর্থনীতির মূল ধারায় এনে বাংলাদেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর পথে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা, সৃজনশীল লেখক ও প্রযোজক
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post