Print Date & Time : 25 April 2026 Saturday 3:15 pm

বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আমানতকারীদের অবস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত বাতিলসহ তিন দফা দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। বিক্ষোভকারীরা দ্রুত তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলটিমেটাম দেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী ১২ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও করার কর্মসূচিও ঘোষণা করেন তারা।

জানা গেছে, আমানতের অর্থ ফেরতের দাবিতে আন্দোলনে নামা কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের আমানতকারীরা গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাপলা চত্বর এলাকায় বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এক পর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান ব্যবহার করে।

বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আমানতকারীরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের সিদ্ধান্তে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের আমানতের ওপর গত দুই বছরের মুনাফা কেটে মাত্র ৪ শতাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ সিদ্ধান্ত আমানতকারীদের জন্য অমানবিক ও অন্যায্য।

বক্তারা বলেন, গত দুই বছর ধরে অনেক আমানতকারী এসব ব্যাংক থেকে মূলধন ও মুনাফা তুলতে পারছেন না। ফলে বহু পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

তারা ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করে চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফাসহ আমানতের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের মতো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে সব ধরনের লেনদেন স্বাভাবিক করা ও মেয়াদ শেষে সঞ্চয়ের অর্থ (এফডি, ডিপিএস, এমটিডিআর) চুক্তি অনুযায়ী ফেরত দিতে হবে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে বলেও তিনি জানান। গত মঙ্গলবার গভর্নরের কার্যালয়ে পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এ বার্তা দেন।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারাÑএক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।

নতুন ব্যাংকটি মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আমানতকারীদের মধ্যে বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হবে। এছাড়া প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীর আমানত বিমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা করে মোট ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৩০ ডিসেম্বর ব্যাংকটির লোগো উšে§াচন করা হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সেটি বাতিল করা হয়। কিছু আমানতকারী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থলে ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিষয়ে তিন মাস ধরেই তৎপর ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগের মাত্র দুদিন পরই তিনি ব্যাংকটির এমডি পদে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে ছাত্র-জনতার অভুত্থ্যানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হয়ে আসেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন লুটপাটের শিকার হয় ব্যাংকগুলো।

এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে-বেনামে তাদের শেয়ার ও ঋণসম্পর্কিত সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষ ও কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দায়িত্ব ছাড়েন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এরপরই গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়।