Print Date & Time : 31 January 2026 Saturday 10:13 am

বাস্তবতার নিরিখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক

অশোক দত্ত : চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি ভালো না হলেও বাস্তবতার নিরিখে প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গত ১৪ অক্টোবর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি বলছে,  প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে অর্থবছর শেষে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে আনা হয়েছে।

প্রতিবেদন-পরবর্তী ১৬ অক্টোবর ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, প্রবৃদ্ধি কমার পেছনে চারটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, সরকারের পলিসি মিক্স বা নীতিগত মিশ্রণ তুলনামূলকভাবে কঠোর হওয়ায় বিনিয়োগ প্রবাহ ধীর হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শুল্কনীতি ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা রপ্তানি ও আমদানি উভয় খাতে প্রভাব ফেলছে। তৃতীয়ত, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে এবং চতুর্থত, আর্থিক খাতের দুর্বলতা; যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না।

আইএমএফ জুন মাসে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ অনুমান করলেও, নতুন প্রতিবেদনে তা ৮ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বছরের শুরুতে সরবরাহ খাতে ধাক্কা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি।

এই প্রসঙ্গে শ্রীনিবাসন বলেন, মূল্যস্ফীতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নামতে পারে। তবে তা নির্ভর করছে পণ্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।

শ্রীনিবাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকারের কড়া আর্থিক ও রাজস্বনীতি বিনিয়োগ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আর্থিক খাতে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধিতে।

এদিকে চলমান ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনায় আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকা আসবে। এ সময় তারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে। তবে তাদের এবারের বৈঠকে রাজস্ব আহরণ ও কর সংস্কার এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কার এই দুই বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হবে বলে সংস্থাটির সূত্রে জানা যায়।

আইএমএফের পূর্বাভাস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, আইএমএফের হিসাবকে প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস বলা ঠিক নয়। আইএমএফ ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে এ বছর প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি। তাই ৪.৮ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সব সংস্থার পূর্বাভাসই প্রায় একই সীমায়, ৪ দশমিক ৮ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। কেবল সরকারের পূর্বাভাসই কিছুটা বেশি, সাড়ে ৫ শতাংশ। অর্থনীতি এখন যে গতিতে চলছে, তাতে আমি মনে করি আইএমএফের পূর্বাভাস বাস্তবতার কাছাকাছি।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অবশ্যই এটা তাদের একটি প্রজেকশন। তবে যদি বাংলাদেশের অর্থনীতি এ বছর ৫ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে। তাহলে বলা যায় পরিস্থিতি কঠিন হলেও দেশ ভালোই করেছে। কারণ, সেটি এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি ভালো নয়, তবে বাস্তবতার নিরিখে এ প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক।

এদিকে সম্প্রীতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যর মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বৈঠকে দেশের পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে বিশ্বব্যাংকের কাছে কারিগরি সহয়তা চেয়েছে প্রতিনিধিদলটি। এরই মধ্যে কিছু অর্থ বিভিন্ন দেশে শনাক্ত হয়েছে বলে জানায়। পাশাপাশি, বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত এড়ানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে বৈঠকে।

অন্যদিকে, ওপেক ফান্ডের সঙ্গে আলোচনায় জ্বালানি আমদানির ক্রেডিট লাইন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। কারণ দেশে তেল ও গ্যাস আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এছাড়া এডিবি, এআইআইবি ও জাইকার সঙ্গে অবকাঠামো ও জলবায়ু তহবিল বিষয়ে বৈঠক করেছে প্রতিনিধিদলটি।

আইএমএফের ২০২৫ সালের গ্লোবাল পলিসি এজেন্ডা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ঋণ, দুর্বল রাজস্ব শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে।

সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বিশ্বস্ত নীতি ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানই জনআস্থার মূল ভিত্তি। রাজনৈতিক চাপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিকে দুর্বল করে, মুদ্রার মান কমায় ও মূল্যস্ফীতি বাড়ায়।

আইএমএফ আরও বলেছে, বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক হতে দিতে হবে, জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে এবং রাজস্ব ঘাটতি কমাতে কর ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের প্রবৃদ্ধি কমানো দেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। নির্বাচনী অনিশ্চয়তা প্রশমিত করা ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইএমএফের সংকেতগুলো উপেক্ষা করা যাবে না। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা এবং বাজারনির্ভর নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

চলতি বছরের ডিসেম্বর বা আগামী জানুয়ারিতে আইএমএফের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি (প্রায় ৮০ কোটি ডলার) ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও, নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত নতুন অর্থ ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, নতুন সরকারের সংস্কার কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পরই পরবর্তী কিস্তি অনুমোদন করা হবে।

আইএমএফের এ অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটনে সংস্থাটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, রিজার্ভ পরিস্থিতি ভালো, ডলার বাজার স্থিতিশীল। আইএমএফের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ; তবে তাদের অর্থ ছাড়া দেশ চলবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফ এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের শর্ত বাস্তবায়নে চাপ বাড়াচ্ছে। তারা নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরই পরবর্তী অর্থ ছাড়ে সম্মত হবে।

২০২২ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে আইএমএফের কাছে সহায়তা চায় বিগত সরকার। তারই পরিপেক্ষিতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে; যা পরবর্তীতে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। তবে এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬০ কোটি ডলার ছাড় করে সংস্থাটি।