# আইপিও তহবিলের ৪০ কোটি টাকা আটকা
# বিএসইসির দিকে রিং শাইন এমডির বৃদ্ধাঙ্গুলি
আনোয়ার হোসাইন সোহেল
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেডকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল অবস্থা। আইপিও তহবিলে জমা থাকা প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগে অনড় কমিশন, আর প্রশাসনিক জটিলতার এই টানাপোড়েনে কয়েক হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী তাদের মূলধন হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময় পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতও চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রিং শাইনের মতো একটি বড় বস্ত্র কোম্পানির কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়ায় তা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড দেশের বস্ত্র খাতের একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সুতা ও ফেব্রিক্স উৎপাদন এবং রপ্তানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক আর্থিক সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে রয়েছে।
ঋণের চাপে থাকা রিং শাইনকে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে কোম্পানিটির দেনা ২০০ কোটি টাকার বেশি। এই ঋণ পরিশোধে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত কোম্পানিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু ঠিক সেই সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যবহারের অনুমতি।
কোম্পানিটির আইপিও তহবিলে থাকা প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। কমিশনের দাবি, আইপিওর সময় নির্ধারিত উদ্দেশ্য পরিবর্তন করতে হলে অন্তত ৫১ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু রিং শাইন কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত সেই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন এবং ৫১ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের মতামত জমা দিলে কমিশন অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করবে। আইনের বাইরে গিয়ে অর্থ ছাড়ের কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দায়ী করছে। রিং শাইন টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ পিয়াল শেয়ার বিজকে বলেন, অতীতের বোর্ডের অনিয়মের দায় বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বহন করছে। অথচ বর্তমান বোর্ড বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কারখানা সচল রাখতে ও উৎপাদন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে কমিশনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে না।
অনিরুদ্ধ পিয়াল বলেন, বিএসইসি এমন সমস্যাগ্রস্ত অন্য অনেক কোম্পানিকে ছাড় দিলেও রিং শাইনের ক্ষেত্রে অযথা কালক্ষেপণ করছে। সময়মতো এই অর্থ ছাড় পেলে বেপজার প্লটগুলো হাতছাড়া হতো না।
পিয়াল জানান, আইপিও তহবিলের প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যাংকে পড়ে আছে। কিন্তু এ অর্থ থেকে কোম্পানি মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে সুদ পাচ্ছে, যা কার্যত কোম্পানির জন্য লোকসান। বাংলাদেশে যেকেনো তফসিল ব্যাংকে এফডিআরের সুদ হার ১০ শতাংশের বেশি। এদিকে বিবেচনায় নিলে কোটি কোটি লোকসান করছে রিং শাইন। শুধু নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এই লোকসান কোম্পানি ও শেয়ারহোল্ডারদের ওপর বর্তাচ্ছে।
অনিরুদ্ধ পিয়াল আরও বলেন, রিং শাইনের আমরা প্রায় অর্ধশতবার বিএসইসির চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ চেয়ে চিঠি দিয়েছি, তবে ইতিবাচক সাড়া পাইনি।
কোম্পানির ৫১ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের সম্মতির শর্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পিয়াল। তার মতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে যথেষ্ট হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু রিং শাইনের ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে। তিনি জানান, কোম্পানির সর্বশেষ বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রায় ৪০০ বিনিয়োগকারী উপস্থিত ছিলেন।
আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যবহার করতে না পারায় কোম্পানিটির উৎপাদন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এর ফলে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা বিপুল বকেয়া পরিশোধও সম্ভব হয়নি।
সাভার ও ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় অবস্থিত রিং শাইনের প্লটগুলোর বিপরীতে বেপজার পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২২০ কোটি টাকা।
পাওনা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে এরই মধ্যে ২৩০ থেকে ২৩৬ নম্বর পর্যন্ত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্লটের ইজারা বাতিল করেছে বেপজা। বর্তমানে এসব সম্পদ নিলামের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রথম দফায় নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় আবারও নিলামের ডাক দেওয়া হয়। আগ্রহী ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বানের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, যদি এই নিলাম সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে কোম্পানিটির উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।
রিং শাইনের বিনিয়োগকারী মাহমুদুল হাসান বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় রিং শাইনের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের অনুমোদন দিলে আমরা আমাদের পুঁজি নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে পারতাম। এখন আমরা শঙ্কায় আছি। একই কথা বলেন, শহিদুল ইসলাম নামে আরেক বিনিয়োগকারী। তিনি বলেন, বিএসইসির আইনের কঠোর প্রয়োগ হোক। তবে সেটা অব্যশই কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীবান্ধব হতে হবে।
২০১৯ সালে রিং শাইন টেক্সটাইলস পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে কোম্পানিটি বাজার থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু তালিকাভুক্তির পরপরই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ ওঠে, ভুয়া প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে এবং আর্থিক প্রতিবেদনে আয় বেশি দেখানো হয়েছে। এসব অনিয়মের ঘটনাই পরে দেশের পুঁজিবাজারে ‘রিং শাইন আইপিও কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়।
তালিকাভুক্তির মাত্র এক বছরের মাথায় ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি শুরু হলে কোম্পানিটি হঠাৎ করেই কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। কোম্পানির দাবি ছিল, বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ায় তারা ব্যবসায়িক সংকটে পড়েছে। তবে পরবর্তী তদন্তে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও আর্থিক অনিয়মের বিষয় সামনে আসে। একই সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অব্যবহƒত আইপিও তহবিল ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। এতে কোম্পানিটি আরও গভীর তারল্য সংকটে পড়ে।
ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় রিং শাইনের প্রায় ৫০টি প্লট ছিল। এর মধ্যে প্রধান উৎপাদনশীল ছয়টি প্লটের ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ বছরের পর বছর বকেয়া পড়ে থাকে।
২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বেপজার কাছে কোম্পানিটির মোট বকেয়া দাঁড়ায় প্রায় ১৮ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একাধিক সতর্কবার্তা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পরও বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় বেপজা শেষ পর্যন্ত এই ছয়টি প্লটের ইজারা স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেয়।
রিং শাইন টেক্সটাইলসের মোট শেয়ার রয়েছে ৫০ কোটি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৫টি। এর মধ্যে পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ শেয়ার। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৫৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ শেয়ার। পুঁজিবাজারের জেড ক্যাটাগরিতে থাকা রিং শাইন টেক্সাইল লিমিটেড কোম্পানির গতকাল লেনদেন শেষে শেয়ারের সর্বশেষ বাজারদর ছিল ৩ টাকা ৬০ পয়সা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতাÑএই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে রিং শাইন টেক্সটাইলসের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এখন আইনি জটিলতা নিরসন এবং নীতিগত সমাধান ছাড়া কোম্পানিটির পুনরুজ্জীবন সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ইনডেক্স এগ্রো তাদের সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতির ভিত্তিতে আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের অনুমোদন পেয়েছিল। এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, সম্প্রতি একটি কোম্পানিকে আমরা ফান্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি। তবে তাদের এখনো চিঠি দেওয়া হয়নি।
