ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : ছুটির দিন মানেই জমজমাট বেচাকেনা। দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা গতকাল শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের আনাগোনায়। এদিন বিভিন্ন পণ্যে মূল্যছাড় পেয়ে খুশি ক্রেতা। বিক্রি ও প্রদর্শনীতে সফলতার আশা ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের। পণ্যের দাম ও মান নিয়ে অভিযোগও রয়েছে। হকারের উৎপাতেও বিব্রত হয়েছেন কেউ কেউ।
কথা হয় মেলা এলাকায় সড়ক ও পার্কিং শৃঙ্খলায় নিয়োজিত টিআই রাজিব বাহাদূরের সঙ্গে। তিনি বলেন, মেলায় শুক্র ও শনিবার গাড়ির চাপ বাড়ে। প্রচুর দর্শনার্থী সমাগম হয়। শুক্রবার বিকাল ৪টার মধ্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় উপচেপড়া ভিড় আর ক্রেতা-দর্শনার্থীদের শোরগোলের শব্দ। হাতে ব্যাগভর্তি পণ্যে ক্রেতাদের ছাড় পাওয়ার স্বস্তি আর গৃহস্থালি পণ্যের পসরায় গৃহিণীদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রি নিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি আবাসন কোম্পানি। চলছে বিনিয়োগ অফার। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্টল সাজিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহীদের নিজস্ব পলিসি বোঝাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কথা হয় স্টল ম্যানেজার হাসিবুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সফল হচ্ছে এবারের মেলা। গত ১৩ দিনে শতাধিক গ্রাহক আমাদের অফার নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। বৃহত্তর অঙ্কের প্রায় পাঁচ শতাধিক বিনিয়োগকারী পাওয়ার প্রত্যাশা করছি।
ঘর সাজানোর অনুষঙ্গ হিসেবে রয়েছে ইস্তাম্বুল ও কাশ্মীরি কার্পেট। সিল্ক, উল ও সিনথেটিক কার্পেটের প্রতি বর্গফুটের দাম ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। বড় আকারের কার্পেটের দাম পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকায় পর্যন্ত। জুতার স্টলগুলোয়ও ভিড় কম নয়। ভারতীয় ও পাকিস্তানি নাগরা, চটি ও স্যান্ডেল মিলছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। শিশুদের নাগরা পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ টাকায়। একই সঙ্গে শীতের পোশাকের স্টলে রয়েছে কাশ্মীরি শাল, কমফোর্টার, বালিশ ও বেডশিট।
পোশাকের ক্ষেত্রে ছেলেদের জন্য ব্লেজার ও কোটির দোকান চোখে পড়ে বেশি। ব্লেজারের দাম শুরু ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে। মেয়েদের জন্য রয়েছে থ্রিপিস, তাঁতের শাড়ি, জামদানি ও খাদি কাপড়ের শাড়ি। প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো থ্রিপিস পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির দাম ৭৫০ টাকা থেকে শুরু করে জামদানির দাম উঠেছে ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
শিশুদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ দুরন্ত সাইকেল। ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে শিশুদের সাইকেল বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ২০০ টাকা থেকে। বড়দের সাইকেলের দাম ১৪ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা। বৈদ্যুতিক প্যাডেল অ্যাসিস্ট সাইকেল মিলছে ছাড়ে ৫৫ হাজার টাকায়। আরএফএলের স্টলে রয়েছে শিশুদের খেলনা ও গৃহস্থালি পণ্য। স্কুটি, রাইডার, ব্লক, বাইক, গাড়ি থেকে শুরু করে রঙিন অ্যাক্রিলিক তৈজসপত্রও পাওয়া যাচ্ছে। প্লেট-বাটির দাম শুরু ৫০ টাকা থেকে।
প্রদর্শনী কেন্দে র বাইরে রয়েছে বাংলাদেশ জেল কারা পণ্যের দোকান। সেখানে দেশের ২৮টি কারাগারের বন্দিদের তৈরি বাঁশ-বেত, পাট, কাঠ ও লোহার তৈরি চারশর বেশি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। আছে আসবাব, পোশাক, জুতা ও নকশিকাঁথা। বিদেশি স্টলের মধ্যে বরাবরের মতোই নজর কাড়ছে তুর্কিস্তানের আলোকবাতির দোকান।
এ ছাড়া জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের স্টলে বিক্রি হওয়া পণ্যের অর্থ যাচ্ছে পুনর্বাসন সহায়তায়। শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা শিশুপার্ক ও বিভিন্ন রাইড। আড়াইহাজার থেকে মেলায় এসেছেন এনামুল হক বিজয়। তিনি জানান, বাণিজ্য মেলার প্রথম দিনই আসার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ঘন কুয়াশা আর শীতের কারণে আসা হয়নি। আজ সকালে আকাশে সূর্যের দেখা পেয়েছি। পৌষের মিষ্টি রোদে আবহাওয়া খুবই ভালো লাগছে, তাই সপরিবারে মেলায় চলে এলাম।
আমিরা বিডি ডট কমের ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম জানান, ‘আজ আকাশে সূর্যের হাসির সঙ্গে বাণিজ্য মেলাও যেন হেসে উঠেছে। সকাল থেকেই ক্রেতা দর্শনার্থীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ করছি। আশা করছি সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়াও অন্যান্য দিনে এখন থেকেই মেলা জমে উঠবে।’
মেলার ইজারাদার ডিজি ইনফোটেক লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ডিরেক্টর মারুফুল আলম বলেন, ‘এমনিতেও মেলায় প্রথম দিকে ক্রেতা দর্শনার্থী কিছুটা কম থাকে। তার মধ্যে প্রথম থেকেই ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহের কারণে জনসমাগম তুলনামূলক কমই ছিল। হঠাৎ তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে। ফলে ক্রেতা-দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে শুরু করেছেন। বিকাল যত ঘনিয়ে আসবে, তত ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছি।’
পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছেÑদুটি মিনি পার্কসহ বিভিন্ন বিনোদন আয়োজন। মেলায় এসে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠছে শিশুরা। সকালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় মিনিপার্কে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য, আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর হৈ-হুল্লোড়। তাদের এ হৈ-হুল্লোড়ে মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। মেলায় আগত শিশুদের আকৃষ্ট করতে দোকানিরাও নানারকম খেলনার পসরা সাজিয়ে বসেছেন। বাহারি খেলনা দেখে শিশুরা সেটি কেনার বায়না ধরছে। মেলায় শিশুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কেউ ছোট্ট পাত্রে রাখা তরলে খেলনার একটি অংশ ডুবিয়ে মুখের কাছে নিয়ে ফু দিচ্ছেন।
বাচ্চাকে রাইডে চড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন সাথী আক্তার। তিনি বলেন, ঢাকায় শিশুদের খেলার জন্য খুব বেশি জায়গা নেই। মেলায় এসে বিভিন্ন রাইডে চড়ে তারা খুব মজা পাচ্ছে। শিশু পার্ক মেসার্স মাসুম এন্টারপ্রাইজের কর্মী দিলীপ বিশ্বাস জানান, ক্রেতা-দর্শনার্থীদের চিত্র-বিনোদনের জন্য মেলায় মিনিপার্ক শিশু-কিশোর দেব আনন্দ উচ্ছ্বাসের কেন্দ বিন্দু হয়ে উঠেছে। এবারের মিনিপার্কে বিভিন্ন রাইডের চড়ে শিশু-কিশোররা খুবই উচ্ছ্বসিত। তাদের অভিভাবকরাও শিশুদের আনন্দ দিতে পেরে খুশি হচ্ছে।
ড্রিমল্যান্ড চিলড্রেন পার্কের রাইডের মালিক ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘মেলায় মিনি পার্কে এবার তার দশটি রাইট রয়েছে। ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় টিকিট কেটে শিশুরা এসব রাইড ব্যবহার করতে পারছে। মেলায় মিনি পার্কে বিভিন্ন রাইডে চড়ে শিশুরা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠছে। বেশ সাড়া পাচ্ছি। মিনি পার্কে এবার ১০টি রাইডস রয়েছে। এক একটি রাইডসে ৫ থেকে ১০ মিনিট উপভোগ করতে পারবে শিশুরা।’
মেলায় জাম্পিং রাইডসে শিশুরা ১০ মিনিট খেলতে পারছে ১০০ টাকায়। সাম্পানের টিকিট মূল্য ৫০ টাকা। হেলিকপ্টার টিকিট মূল্য ১০০ টাকা। জাম্পিং, সুপার বক্স, টিকিট মূল্য ১০০ টাকা। ইলেকট্রনিক বোট, ড্রাগন, হর্স রাইডিং, মিনি ট্রেনের টিকিট মূল্য ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের লোকজন শিশুদের বিভিন্ন রাইডে উঠিয়ে খুবই আনন্দ পাচ্ছেন। প্রথম দিকে মেলা তেমন না জমলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও ছুটির দিন থেকে এবারের মেলা জমে উঠতে শুরু করেছে।
মেলায় বিভিন্ন ক্যাটেগরির ৩২৭টি প্যাভিলিয়ন, স্টল, রেস্তোরাঁ, দেশীয় উৎপাদক-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কুড়িল বিশ্বরোড, ফার্মগেট (খেজুরবাগান-খামারবাড়ী), নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বাণিজ্যমেলার উদ্দেশ্যে বিআরটিসির ২০০টির বেশি শাটল বাস চলছে।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post