Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 3:46 am

বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে আলিফ গ্রুপের ২ প্রতিষ্ঠান!

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আলিফ গ্রুপের দুই কোম্পানি আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (এএলআইএফ) ও আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (এআইএল) কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেআইটি ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেটেডের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত পৃথক পর্ষদ সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। গতকাল বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ জেআইটি ইন্টারন্যাশনালের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি-বিধান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর।
এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পরিচালক মো. আজিমুল ইসলামকে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। মির হাসান আলীকে চেয়ারম্যান এবং জিয়াউল আবেদিনকে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। তারা উভয়েই স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া মো. তুহিন রেজাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পর্ষদ ব্যবস্থাপনাকে সব ধরনের আইনগত, করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশলগত অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণও জেআইটি ইন্টারন্যাশনালের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের পর কার্যকর হবে।
এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আজিমুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান হিসেবে মির হাসান আলী এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে জিয়াউল আবেদিনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তারা স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। কোম্পানির নতুন সিইও হিসেবে মো. তুহিন রেজা এবং কোম্পানি সেক্রেটারি হিসেবে মো. কামাল হোসেনকে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনাকে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কারখানার প্রায় ৬০০ শ্রমিকের বেতন বকেয়া রেখেছে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং। অনেকের ক্ষেত্রে এই বকেয়া ৩ থেকে ৪ মাসে গিয়ে ঠেকেছে। বারবার বেতন পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও মালিকপক্ষ তা রক্ষা করেনি। বাসা ভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা সড়কে অবরোধ করেন। এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
অন্যদিকে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের লভ্যাংশ ঘোষণার দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও সেই লভ্যাংশ পাননি এক বিনিয়োগকারী। লভ্যাংশ দেওয়ার আবেদন নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো ফল হয়নি। সম্প্রতি এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান বরাবর আবার লিখিত আবেদন করেছেন পুঁজিবাজারের ওই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী।
জানা গেছে, ওই ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীর নাম মো. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া। অভিযোগের বিষয়ে ওই বিনিয়োগকারী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ২০২৪ সালের জন্য যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল, তা এখনও তার ব্যাংকের হিসাবে পাঠানো হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি একাধিকবার কোম্পানিটির কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাইনি।’
পরে নির্দিষ্ট তারিখে ওই বিনিয়োগকারী বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একই সঙ্গে কমিশনের একজন কমিশনারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন মো. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া।
ওই বিনিয়োগকারীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) শেষে যথাসময়ে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পরিশোধ করছে না। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব থাকায় কোম্পানিগুলো ঘোষিত লভ্যাংশ দীর্ঘদিন আটকে রাখার সুযোগ পাচ্ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘোষিত লভ্যাংশ সময়মতো বিতরণ না হলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং এক বছর আগের ঘোষিত শেয়ারপ্রতি এক পয়সা করে মোট এক কোটি ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা লভ্যাংশ পরিশোধ করেনি। অথচ একই মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ পরিশোধ করছে। এতে কোম্পানিটির শেয়ারমূল্যও বাড়ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে আলিফ গ্রুপে পোশাক খাতের দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি এবং আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। কোম্পানিটি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের এক শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ মোট লভ্যাংশের পরিমাণ মাত্র এক কোটি ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। কিন্তু আট মাসেও এ লভ্যাংশ পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে নিয়মিতভাবে শেয়ারের দাম কমেছে।
অপরদিকে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। এ লভ্যাংশ কিছুটা দেরিতে হলেও উদ্যোক্তারা পরিশোধও করে। তবে কোম্পানিটি বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের কথা বলা হলেও সেসব ঘোষণার তেমন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কয়েক বছর আগে ডেনিম প্রস্তুতকারী কোম্পানি রয়েল ডেনিম লিমিটেডের মালিকানা অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তখন রয়েল ডেনিমের উদ্যোক্তাদের কাছে থেকে শেয়ার ক্রয়, শ্রমিকদের বেতন, বোনাস, বেপজা বকেয়া পাওনা এবং ইসলামী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কার্যকর পদক্ষেপ ও অধিগ্রহণের সব প্রক্রিয়া পরিপালনের কথা ছিল। কিন্তু অধিগহণের শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হয় আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ।
বেশ কয়েকজন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিজকে বলেন, আলিফ গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ বিতরণে দুই রকমের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, যা আমাদের জন্য হতাশাজনক। আর আলিফ গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণের কথাও বললেও নির্দিষ্ট সময়ে তেমন কোনো কিছু ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, যা ছিল শুধু নিজেদের দাম বাড়ানোর জন্য ঘোষণা। এসব আয়োজন নিজেরাই লাভবান হওয়ার উদ্যোগ, যা কমিশনের তদন্ত করা উচিত।