Print Date & Time : 19 April 2026 Sunday 7:27 am

বিনিয়োগকারীর মনোযোগ সরাতে বড় অঙ্কের লভ্যাংশ ঘোষণা

নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবেই কমছে। এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ ভিন্ন দিকে নিতে কোম্পানিটি বড় অঙ্কের লভ্যাংশ বিতরণের ঘোষণা দেয়। তবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দেওয়া লাফার্জহোলসিমের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে কোম্পানিটির শেয়ারদর পতনের ধারায় রয়েছে।
ডিএসইর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত লাফার্জহোলসিমের শেয়ারদর কমেছে প্রায় ১৫ টাকা। ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৬৫ টাকা ৩০ পয়সা। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৪২ টাকা ৭০ পয়সায় নেমে গিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর কিছুটা বেড়ে ৫০ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ডিএসইর গ্রাফ টেন্ডে দেখা যায়, লাফার্জহোলসিমের শেয়ারদর নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এ হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ারদর গত দুই বছরে (২০২৪-২৬ এপ্রিল ১৬ পর্যন্ত) কমে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে শেয়ারধারীদের গত বছরের জন্য প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা করে লাফার্জহোলসিম। গত বছর শেষে সব মিলিয়ে কোম্পানিটি ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৮ শতাংশ ছিল অন্তবর্তীকালীন লভ্যাংশ, যা শেয়ারধারীদের মধ্যে এরই মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ২২ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয় অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভায়।
লাফার্জহোলসিম জানিয়েছিল, অন্তর্বর্তী ও চূড়ান্ত লভ্যাংশ মিলিয়ে গত বছরের জন্য কোম্পানিটির শেয়ারধারীরা প্রতি শেয়ারের বিপরীতে চার টাকা করে লভ্যাংশ পাবেন, যার মধ্যে শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ৮০ পয়সা বা ১৮ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ বাবদ কোম্পানিটি বিতরণ করেছে ২০৯ কোটি টাকার বেশি। আর চূড়ান্ত লভ্যাংশ হিসেবে ২২ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ২ টাকা ২০ পয়সা করে আগামী বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম শেষে বিতরণ করা হবে। চূড়ান্ত লভ্যাংশ বাবদ কোম্পানিটি বিতরণ করবে প্রায় ২৫৬ কোটি টাকা। আগামী মে মাসে কোম্পানিটির এজিএম অনুষ্ঠিত হবে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শেষে লাফার্জহোলসিম সব ধরনের খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রায় ৫১১ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি মুনাফা করেছিল ৩৮২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে লাফার্জহোলসিমের মুনাফা ১২৯ কোটি টাকা বা ৩৪ শতাংশ বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মুনাফায় ফেরার পর লাফার্জহোলসিম গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে। কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে ৫৯৪ কোটি টাকা, সেটি ২০২৩ সালে। এরপর গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা করে কোম্পানিটি। গত বছর কোম্পানিটি যে মুনাফা করেছে তার ৯১ শতাংশই লভ্যাংশ হিসেবে শেয়ারধারীদের মধ্যে বিতরণ করবে কোম্পানিটি। বছর শেষে কোম্পানিটি যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে তার ভিত্তিতে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
কোম্পানিটি লভ্যাংশ বাবদ যে অর্থ বিতরণ করবে তার মধ্যে প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা পাবেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা। কারণ কোম্পানিটির শেয়ারের ৬৩ শতাংশের বেশি রয়েছে এসব উদ্যোক্তা-পরিচালকের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির প্রায় ২২ শতাংশ শেয়ার। এর বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী পাবে ১০২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির প্রায় ১৪ শতাংশ শেয়ার। এর বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন ৬৫ কোটি টাকা। লভ্যাংশ বাবদ বাকি কয়েক কোটি টাকা পাবেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। তাদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির প্রায় এক শতাংশ শেয়ার।
লাফার্জহোলসিম বলছে, গত বছর সরকারি খাতে বিনিয়োগের মন্দা ও বেসরকারি খাতে কম ঋণ প্রবৃদ্ধির মধ্যেও কোম্পানিটি ভালো ব্যবসা করেছে। গত বছর কোম্পানিটি ২ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে, আগের বছর যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ছয় শতাংশ। হোলসিম ওয়াটার প্রোটেক্ট ও সুপারক্রিট প্লাসের মতো নতুন ব্র্যান্ডের পণ্য গত বছর কোম্পানিটির ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব কাজী মো. কামরুল হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও আমাদের ব্যবসার ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী। অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন খাতের ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো এবং নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সামনে প্রবৃদ্ধির ভালো সম্ভাবনা দেখছি। উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে কাজ করছি।’
লাফার্জ দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০০৩ সালে। ওই সময় কোম্পানিটির নাম ছিল লাফার্জসুরমা সিমেন্ট। এটি দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এখন পর্যন্ত একমাত্র গ্রিনফিল্ড কোম্পানি। অর্থাৎ কোম্পানিটি উৎপাদন শুরুর আগেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রায় হাজার কোটি টাকায় বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী সিমেন্ট খাতের আরেক বিদেশি কোম্পানি হোলসিম কিনে নেয় লাফার্জ। পরে দুই কোম্পানি একীভূত হয়ে লাফার্জহোলসিম নামে কার্যক্রম শুরু করে।
এদিকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানিটি ‘এ’ ক্যাটাগরির তালিকায় থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দিয়ে সেখানে কারখানা চালু রাখার অভিযোগে হোলসিমের লাফার্জ ইউনিটকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল ফ্রান্সের প্যারিসের একটি আদালত এ রায় দেন।