Print Date & Time : 13 March 2026 Friday 5:19 am

বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক অতিরিক্ত কর কমিশনারের মূল বেতন দুই ধাপ অবনমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তার নাম সেহেলা সিদ্দিকা। তিনি এনবিআর সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিতে কর্মচারীদের দাপ্তরিক দায়িত্ব বাদ দিয়ে রাজস্ব ভবনে আসতে বাধ্য করেছেন। ওই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সই করা আদেশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গতকাল রোববার এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি জানিয়েছেন।

গত বছরের ১৮ আগস্ট এক আদেশে এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের ওই অতিরিক্ত কমিশনারসহ চার কাস্টমস কমিশনারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল, যেখানে এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচি পালন ও দেশের রাজস্ব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়।

এনবিআরের ওই আদেশ সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকা আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, ঢাকায় কর্মরত থাকাকালে গত বছরের ২১ মে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একাধিক বার্তা দিয়ে আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ করে নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

ওই বার্তায় ঢাকাস্থ কর্মকর্তাদের রাজস্ব ভবনে উপস্থিত থাকা এবং ঢাকার বাইরে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বার্তার মাধ্যমে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক দায়িত্ব পরিত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এতে দেশের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ মনে করে, তার এ ধরনের কার্যকলাপ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০এ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং একই বিধিমালার ৩২ বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল। পাশাপাশি এটি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারায় বর্ণিত ‘অসদাচরণ’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অভিযোগের পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে কৈফিয়ত তলব করা হয়। কৈফিয়তের জবাব দাখিল ও ব্যক্তিগত শুনানির আবেদনের পর ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে কর্তৃপক্ষ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সেহেলা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তার কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থি এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সব নথি

ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪(২)(ঘ) বিধি অনুযায়ী শাস্তি হিসেবে তার বেতন গ্রেড দুই ধাপ অবনমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তার বর্তমান মূল বেতন ৭১ হাজার ২০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৫ হাজার ৮২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই আদেশে তার সাময়িক বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার করা হলো।

রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে এনবিআর বিলুপ্তির জন্য গত বছরের ১২ মে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। এ নিয়ে শুল্ককর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। তারা মতামতের ভিত্তিতে যৌক্তিকভাবে রাজস্ব খাত সংস্কারের আন্দোলন শুরু করেন। প্রায় দেড় মাসজুড়ে চলে এই আন্দোলন। জুনের শেষ দিকে আন্দোলনের কারণে সারা দেশে রাজস্ব আদায় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। পরে প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বরখাস্ত, অবসর প্রদানসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেই শাস্তির আওতায় পড়েন সেহেলা সিদ্দিকা। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে এই আন্দোলন হয়। সেহেলা সিদ্দিকা ওই পরিষদের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) প্রজ্ঞাপন অনুসারে, সেহেলা সিদ্দিকা গত বছরের ২১ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (হোয়াটসঅ্যাপ) বিকাল ৫টা ৪৬ মিনিটে লেখেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাটের মাঠপর্যায়ের ঢাকার সব সহকর্মীদের আগামীকাল সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে এনবিআরে আগমন ও বিকাল ৫টা পর্যন্ত অবস্থান করার জন্য এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ কর্তৃক অনুরোধ করা হলো। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাটের মাঠপর্যায়ের সব সহকর্মীদের নিজ নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট  থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করার জন্য এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ কর্তৃক অনুরোধ করা হলো।’

একই দিন রাত ৯টা ৪৩ মিনিটে সেহেলা সিদ্দিকা লেখেন, ‘বিশেষ ঘোষণা, আগামীকাল ২২ মে বৃহস্পতিবার ঘোষিত কর্মসূচির ক্ল্যারিফিকেশনÑ১. এনবিআর ও ঢাকার সব দপ্তরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবস্থান কর্মসূচি চলবে সকাল ৯টা থেকে এনবিআরে। ২. আগামীকাল আমদানি, রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা আওতামুক্ত থাকবে।’ একই দিন রাত ৯টা ৪৭ মিনিটে সেহেলা সিদ্দিকা আরও লেখেন, ‘বিকাল ৫টা পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি বহাল থাকবে।’