নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর এবার বাড়ানো হয়েছে এলপিজি গ্যাসের দাম। চলতি মাসে দুই দফা দাম বেড়েছে। এবার ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন দাম ঘোষণা করে। এই দাম গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকেই কার্যকর হয়। এর আগে, এপ্রিলের শুরুতেই ৩৮৭ টাকা দাম বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে এক মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে মোট ৫৯৯ টাকা।
বিইআরসি প্রতিমাসে দাম নির্ধারণের নিয়ম অনুযায়ী, গত ২ এপ্রিল চলতি মাসের জন্য নতুন দামের ঘোষণা দেয়। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৭২৮ টাকা; যা আগের মাসের তুলনায় ৩৮৭ টাকা বেশি। যুদ্ধের কারণে জাহাজভাড়া বাড়ায় দাম সমন্বয় করা হয়।
বিইআরসি বলছে, বাজারে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৬১ টাকা ৬৬ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহƒত হয় গৃহস্থালির কাজে। অভিযোগ আছে, প্রতি সিলিন্ডারে বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা।
সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহƒত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।
এদিকে, এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধির আগেই জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। গত শনিবার রাত থেকেই নতুন দরে তেল বিক্রি শুরু হয়েছে; যা পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। এছাড়া প্রতি লিটার কেরোসিনের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩০ টাকা।
সবমিলিয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত দামের তুলনায় দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন সমন্বয়ে ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে, অর্থাৎ লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে, এতে লিটারে ১৮ টাকা বেশি গুনতে হবে ভোক্তাকে।
অন্যদিকে প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা হয়েছে, এতে লিটারে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে, যেখানে লিটারে ১৯ টাকা দাম বেড়েছে।
ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের গত ৩১ মার্চের স্মারকমূলে জারিকৃত ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্য পরিবর্তন করে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য লিটারপ্রতি ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় পুনর্নির্ধারণ করা হলো। পুনর্নির্ধারিত এই মূল্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত, যা গতকাল থেকে কার্যকর হবে।
এ ক্ষেত্রে ডিপোর প্রথম ৪০ কিলোমিটারের অতিরিক্ত দূরত্বের ক্ষেত্রে সড়কপথে ট্যাংকলরিযোগে জ্বালানি তেল পরিবহনের ভাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা গত ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখের প্রজ্ঞাপনমূলে নির্ধারিত হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।
জ্বালানি খাতে এই ধারাবাহিক দাম সমন্বয়ের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পিডিবি থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেবে বলেও জানা যায়। এতে সামনের দিনে সামগ্রিক ব্যয় আরো বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে চাপে রয়েছে সাধারণ মানুষ। জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময় তেলের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়, এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, তেলের দাম যখন বিশ্ববাজারে ১২০ ডলার থেকে নেমে ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, এখন তেলের দাম বৃদ্ধির কী দরকার ছিল? এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১৫ ভাগ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে, সব উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, সব বেড়ে যাবে। বাজারের ওপরে তো সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে দামে কি এলপিজি পায় মানুষ? পাচ্ছে না। রেগুলেটরি কমিশনের দায়িত্ব নির্ধারিত দাম এনফোর্স করা। সেটা মানাতে পারল না, পারছে না। তার জন্য ফৌজদারি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা, তাদের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার কথাÑকিচ্ছু করতে পারেনি। কোনো কিছু করার দায় নেই।
রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলোÑবিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর, বিপিসি, পেট্রোবাংলাÑসবাই নিষ্ক্রিয়, সবাই অচল। এগুলো অচল হলে সরকার কি আর সচল থাকতে পারে? এগুলোই তো সরকারের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এভাবে এই রকম অবস্থার মধ্য দিয়ে যে অর্থনীতি আমরা দেখতে পাই, সে অর্থনীতিকে কি আর সচল বলা যায়? তা দিয়ে কি এই ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট হয়? তা দিয়ে কি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৮ রাখা যায়?
গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ার পরেও সরকার জনগণের কষ্টের কথা বিবেচনা করে দেশে তেলের দাম খুব সামান্য বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে ইতোমধ্যে সরকারের দুই বিলিয়ন ডলার বাড়তি খরচ হয়েছে।
এদিন সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তহবিলের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। দেশের জনগণের স্বার্থে, তাদের কথা মাথায় রেখে এতদিন দাম বাড়ায়নি সরকার। সবাই প্রশ্ন করেছে, কেন তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে না, তহবিল খালি হয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশের মতো দাম বেশি বাড়ানো হয়নি। তহবিলের ওপর অনেক প্রেশার (চাপ) তৈরি হয়েছিল বলে দাম বাড়ানো হয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও আগামী বাজেটের কথা মাথায় রেখে দাম সামান্য বাড়ানো হয়েছে।

Print Date & Time : 20 April 2026 Monday 5:10 am
বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: