Print Date & Time : 14 January 2026 Wednesday 4:44 am

বিশ্ববাজারে সোনার দামে নতুন রেকর্ড

শেয়ার বিজ ডেস্ক : বিশ্ববাজারে সোনার দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে। ইরানে চলমান বিক্ষোভের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের হুমকি এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার জেরে সোনার দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত আছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারের প্রভাবে দেশের বাজারেও রেকর্ড দামে পৌঁছেছে সোনা।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম বাড়ানো হয়েছে। সোমবার রাতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পর দেশের বাজারে সোনার দাম এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

স্পট মার্কেটে বুলিয়ন সোনার দাম গত সোমবার আউন্সপ্রতি চার হাজার ৬২৯ ডলারে ওঠে। এরপর অবশ্য গতকাল মঙ্গলবার সোনার দাম কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের আগাম দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি চার হাজার ৫৮৫ ডলারে নেমে আসে। খবর: গোল্ড প্রাইস ডট অর্গ।

গত বছর সোনার দাম বাড়বাড়ন্ত হলেও ডলারের দাম কমেছে। সেই লোকসান ডলার কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করার পর ডলারের দাম বিশ্ববাজারে এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। এই পদক্ষেপে কেন্দ ীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও মার্কিন বন্ডের ওপর আস্থা হুমকির মুখে পড়েছে।

রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্তে সোমবার সাবেক ফেডপ্রধানদের পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতাও প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

একই সময়ে গোল্ডম্যান স্যাকস ও মর্গান স্ট্যানলির মতো বড় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ধারণা, চলতি বছরের জুন ও সেপ্টেম্বর মাসে নীতি সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট হারে কমতে পারে। বিষয়টি হলো, সুদহার কমে গেলে এবং ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে যেসব সম্পদের ওপর সুদ নেই, সেসব সম্পদের চাহিদা বাড়ে। সে কারণে সোনার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

১৯৭৯ সালের পর সোনার সবচেয়ে পয়মন্ত সময় চলছে এখন। ২০২৫ সালে নিউইয়র্কে যে সোনার আগাম লেনদেন হয়, সেখানে মূল্যবান এই ধাতুর দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ।

এর আগে এক বছরে সোনার দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সময়। তখন মধ্যপ্রাচ্যে সংকট চলছিল। ইরানে হয়ে গেছে ইসলামি বিপ্লব। বাড়ছিল মূল্যস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে চলছিল জ্বালানিসংকট।

নানা সংকটে ১৯৭৯ সালে সোনার দাম ১২৬ শতাংশ বেড়েছিল। বছরের শুরুতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ২২৬ ডলার। বছরের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১২ ডলার। তার ৪৬ বছর পর সোনার আগাম দাম বাড়ল ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে আর কোনো বছরে সোনার দাম এতটা বাড়েনি।

সংকটের মধ্যেই সাধারণত সোনার মূল্য বৃদ্ধি পায়। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, সংকটের মধ্যে সোনা কেনাই ভালো। মূল্যস্ফীতি বাড়বে বা কমবে, ডলারের মূল্যমান কমবে বা বাড়বে; কিন্তু সোনার দাম সচরাচর কমে না। ফলে সোনার এ বাড়বাড়ন্ত।

বাস্তবতা হলো, ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতি আউন্স সোনার আগাম দাম ছিল ২ হাজার ৬৪০ ডলার। বছরের শেষ প্রান্তে এসে সেই সোনার আগাম দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ ডলারে ওঠে। এখন তা ৪ হাজার ৬০০ ডলার পেরিয়ে আবার কিছুটা কমল।

বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ২০২৬ সালে প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলারে উঠতে পারে।

সোনার মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো, বিভিন্ন দেশের কেন্দ ীয় ব্যাংকের বাড়তি সোনা কেনা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যানুসারে, এ ক্ষেত্রে সবার আগে আছে চীন। কারেন্সি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উলফ লিনডাহল সিএনএনকে বলেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চীনের কেন্দ ীয় ব্যাংক সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ মার্কিন ট্রেজারি ও ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্য।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এ প্রবণতা আরও গতি পায়। ওই সময় পশ্চিমা দেশগুলো মার্কিন ডলারে সংরক্ষিত রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করে। ফলে রাশিয়া ও একই সঙ্গে চীন ডলারে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর পথ খুঁজতে শুরু করে বলে জানান লিনডাহল।

স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন এক নোটে বলেন, বর্তমানে কেন্দ ীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার কারণ ভিন্ন। এর কারণ মূলত ভূরাজনীতি। সার্বভৌম রিজার্ভ জব্দ হওয়া এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বিভাজনের কারণে সোনার চাহিদায় নতুন কাঠামোগত মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এ প্রবণতা আরও অনেক দিন চলবে।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে ভালো মানের, অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫ টাকা। দেশের বাজারে এটাই সোনার সর্বোচ্চ দাম।

গত শনিবার রাতে দেশের বাজারে সোনার দাম ভরিতে এক হাজার ৫০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর সোমবার রাতে আবারও সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। এবার ভরিতে এক লাফে চার হাজার ১৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে।