শিক্ষা ডেস্ক: চব্বিশ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন অধ্যাপক রহমান। বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন লম্বা সময়। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, হতাশা আর সাফল্যের সাক্ষী তিনি। সেদিন নিজের ডেস্কে বসে গতানুগতিক সিলেবাসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। যুগ কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাতের বিপ্লব পুরো দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে, কিন্তু আমাদের কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম যেন সেই পুরোনো জায়গাতেই থমকে আছে।
তার মনে পড়ল গত ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী মেয়েটির কথা। মেয়েটি দেশেই থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষমেশ পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে। কারণ, এখানকার ডিগ্রিতে আন্তর্জাতিক মান বা গ্লোবাল রিকগনিশন নিয়ে তার সংশয় ছিল। অধ্যাপক রহমানের মনে সেদিন একটা আক্ষেপের জš§ হয়Ñআচ্ছা, মেয়েটিকে যদি বিদেশে না গিয়ে দেশেই বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটির ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যেত? যদি আমাদের দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমআইটি, অক্সফোর্ড বা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের মতো কোনো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের ‘জয়েন্ট ডিগ্রি’ বা যৌথ ডিগ্রির ব্যবস্থা থাকত?
গল্পটা শুধু অধ্যাপক রহমানের একার নয়, দেশের প্রায় সব সচেতন শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীর। ‘জয়েন্ট ডিগ্রি প্রোগ্রাম’ বা যৌথ ডিগ্রি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেই পড়াশোনা করবে, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু কোর্স বা ক্রেডিট সম্পন্ন করবে বিদেশি কোনো পার্টনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। পড়ালেখা শেষে যে সনদটি জুটবে, তাতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়েরই নাম ও স্বীকৃতি থাকবে। এই একটি উদ্যোগ আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে পারে।
কিন্তু বিশ্বের সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমন পার্টনারশিপ গড়া তো আর মুখের কথা নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সদিচ্ছা এবং নীতিনির্ধারকদের সাহসী কিছু পদক্ষেপ।
নীতিনির্ধারকদের করণীয়: প্রথমেই আসি নীতিনির্ধারক বা পলিসি মেকারদের কথায়। একটা জয়েন্ট ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালুর জন্য সরকারি পর্যায়ে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, তার কিছু বাস্তবসম্মত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নমনীয় ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন: আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রথমেই তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ক্রেডিট ট্রান্সফার, কারিকুলাম শেয়ারিং এবং যৌথভাবে ডিগ্রি প্রদানের বিষয়গুলোকে আইনি বৈধতা ও সহজবোধ্য কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। নিয়মকানুন এমন হতে হবে যেন কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এখানে কাজ করতে এসে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আগ্রহ না হারায়।
২. সিড ফান্ড বা প্রাথমিক তহবিল গঠন: বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমনিতেই আমাদের সঙ্গে পার্টনারশিপ করতে আসবে না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, সমঝোতা স্মারক (গড়ট) স্বাক্ষর এবং যৌথ গবেষণার জন্য প্রাথমিক অর্থের প্রয়োজন। সরকার একটি ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফান্ড’ তৈরি করতে পারে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন চুক্তির দিকে এগোতে চাইবে, এই ফান্ড থেকে তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
৩. কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে মেলবন্ধন: বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনোভাবেই পুরোনো, থমকে থাকা সিলেবাসের সঙ্গে নিজেদের নাম যুক্ত করবে না। তাই আমাদের কারিকুলাম ঢেলে সাজাতে হবে। বইয়ের পড়ার সঙ্গে বাস্তব কাজের বা ইন্ডাস্ট্রির সরাসরি সংযোগ থাকতে হবে। অ্যাকাডেমিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মাঝে যে বিস্তর ফারাক, তা ঘুচিয়ে সিলেবাসে আধুনিক যুগের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি, অ্যানালিটিক্স এবং গবেষণার সন্নিবেশ ঘটাতে হবে।
পথের কাঁটা এবং উত্তরণের উপায়: স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগলেও, বাস্তবে এই পথে হাঁটতে গেলে বেশ কিছু পাহাড়সম বাধা সামনে এসে দাঁড়াবে। তবে সঠিক পরিকল্পনায় এগুলো টপকে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
বাধা ১: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতি
আমাদের সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ধীরগতি বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করে। একটা চুক্তির খসড়া অনুমোদন হতেই যদি মাসের পর মাস লেগে যায়, তবে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুখ ফিরিয়ে নেবে।
উত্তরণের উপায়: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি ডেডিকেটেড ‘ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন সেল’ বা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে। এই সেলের কাজই হবে শুধু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তির বিষয়গুলো দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা।
বাধা ২: শিক্ষক মূল্যায়ন ও মানের ব্যবধান
সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পার্টনারশিপের আগে দেখবে আমাদের শিক্ষকদের মান কেমন। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক মূল্যায়নের পদ্ধতি বেশ পুরোনো। গবেষণার চেয়ে ক্লাস নেওয়াই এখানে মুখ্য। অন্যদিকে, বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফ্যাকাল্টি ইভ্যালুয়েশন ম্যাট্রিক্স বা শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি হয় ভীষণ ডায়নামিক।
উত্তরণের উপায়: শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করে গবেষণায় জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, ‘ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালু করা যেতে পারে, যেখানে আমাদের শিক্ষকরা এক সেমিস্টার সেখানে পড়াবেন এবং তাদের শিক্ষকরা এখানে এসে পড়িয়ে যাবেন। এতে মানের ব্যবধান দ্রুত ঘুচবে।
বাধা ৩: সনদের গ্রহণযোগ্যতা এবং ডেটা নিরাপত্তা
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে বিশ্বাস করবে যে আমাদের দেশের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন বা ট্রান্সক্রিপ্ট (মার্কশিট) শতভাগ স্বচ্ছ? ম্যানুয়াল সিস্টেমে নম্বর টেম্পারিং বা জালিয়াতির ভয় থাকে, যা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই মেনে নেবে না।
উত্তরণের উপায়: এখানেই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ব্যবহারটা করতে হবে। সনাতন পদ্ধতির বদলে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং এবং ট্রান্সক্রিপ্ট সংরক্ষণে ‘ব্লকচেইন’ প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক ডেটা সিকিউরিটি সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্লকচেইনে রাখা তথ্য কেউ পরিবর্তন বা জালিয়াতি করতে পারে না। এমন একটি নিরাপদ সিস্টেম দেখাতে পারলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আস্থা অর্জন করা অনেক সহজ হবে।
বাধা ৪: আর্থিক অসংগতি
যৌথ ডিগ্রির খরচ সাধারণ ডিগ্রির চেয়ে স্বভাবতই একটু বেশি হবে। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন হতে পারে।
উত্তরণের উপায়: এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করপোরেট স্পন্সরশিপের ব্যবস্থা করতে পারে। দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই জয়েন্ট ডিগ্রির খরচ বহন করবে, এই শর্তে যে পড়ালেখা শেষে ওই শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট কয়েক বছর সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে। এর ফলে শিল্পের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি হবে, আবার শিক্ষার্থীর আর্থিক চিন্তাও দূর হবে।
শেষের আগে: অধ্যাপক রহমান তার ডেস্কের ওপর থেকে পুরোনো সিলেবাসটা সরিয়ে রাখলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখলেন একদল তরুণ-তরুণী ক্যাম্পাসের মাঠে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের চোখেমুখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। আমরা যদি আজ সঠিক নীতিমালা, প্রযুক্তির ব্যবহার আর একটুখানি সাহসের ওপর ভর করে জয়েন্ট ডিগ্রি প্রোগ্রামের এই দুয়ারটা খুলে দিতে পারি, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যাবে।
তখন হয়তো সমাবর্তনের দিন আমাদের ছেলেমেয়েরা এমন একটা সনদ হাতে নিয়ে হাসবে, যার একপাশে থাকবে আমাদের প্রিয় লাল-সবুজের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, আর অন্যপাশে জ্বলজ্বল করবে বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের লোগো। এই একটি উদ্যোগ শুধু আমাদের শিক্ষার মানই বাড়াবে না, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের তরুণদের করে তুলবে অপ্রতিরোধ্য। স্বপ্নটা বিশাল, কিন্তু শুরুটা করতে হবে আজই।

Print Date & Time : 20 April 2026 Monday 3:23 am