Print Date & Time : 19 April 2026 Sunday 7:46 am

বিস্ময়কর সবজি-রাজ্য

ডা. মনিরুজ্জামান: ‘মানবস্বাস্থ্যের জন্য এবং পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিরামিষাশী হওয়ার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না।’ কালজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের কথা এটি। বলেছিলেন তা-ও প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু কেন? বিজ্ঞানীর দর্শন-চেতনায় খাবারদাবার ঢুকে পড়ার রহস্যটাই বা কী? বোধ করি, একবিংশ শতাব্দীর ভুল খাদ্যাভ্যাসজনিত স্বাস্থ্য-দুর্যোগ তিনি কিছুটা আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত অনুন্নত দেশ নির্বিশেষে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ফলমূল ও সবজির পুষ্টিগুণের উপযোগিতা সম্পর্কিত তথ্যের বাস্তব প্রয়োগ তাদের জীবনে ঘটাতে পারছেন না। ফলে সারা পৃথিবীতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের ওজন এখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
এ অবস্থায় পুষ্টিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ, প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খান। বেছে নিন প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের তুলনায় তাজা খাবার। আর যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন ‘রেড মিট’ বা গরু-খাসি-মহিষ-ভেড়া ইত্যাদি প্রাণীর মাংস।
তবে শুধু শাকসবজি ফলমূল খেলেই হবে না, কোন ফল বা সবজি খেতে হবে বা কতটুকু খাব সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একটি কলায় মোট ১২০ ক্যালরি আছে, যা দুটো রুটির মোট ক্যালরির সমপরিমাণ। পেঁপে, পেয়ারা, কামরাঙা, আমলকীতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, বি ও সি এবং সেইসঙ্গে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম।
ঢেঁড়সে আছে প্রচুর আঁশ, যা হজমে সহায়ক। মরিচে আছে ভিটামিন সি। গাজর ও অন্যান্য হলুদ সবজি যেমন মিষ্টি কুমড়ায় রয়েছে ভিটামিন এ, যা চুলের কোষের পূর্ণতা আনে আর ত্বক ও চোখ ভালো রাখে। কাঁচা পেঁপে হজমে সহায়ক এবং অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রণে তুলনাহীন। এতে আছে ভিটামিন এ, সি ও বি কমপ্লেক্স, এমাইনো অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। এতে আরও আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্যে উপকারী। আর সবুজ শাক হলো প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, আঁশ এবং মিনারেলের উৎস।
দেহকোষের ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করে রোগের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ করে চলা এই ফুড-সোলজারগুলো ডায়াবেটিস, হƒদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
এই যে এত সব পুষ্টি, অতিরিক্ত তাপে রান্না করলে বা বেশি সেদ্ধ করলে অবশ্য সবই পণ্ড। কারণ, সব ধরনের শাকসবজিতেই রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু এনজাইম বা পাচক রস, যা হজমে সহায়তা করে। কিন্তু কোনো সবজি পুরোপুরি বা অতিরিক্ত সেদ্ধ করলে সেই বিশেষ এনজাইমের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই শাকসবজি যতটা সম্ভব কম সেদ্ধ করুন, পারলে আধা সেদ্ধ করে খাওয়ার অভ্যাস করুন। এছাড়াও সবজি ধুয়ে নিতে হবে কাটার আগে। কাটতে হবে বড় বড় টুকরো করে। আর খোসায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন। যেমন আলুর খোসায় রয়েছে ভিটামিন বি, সি, পটাশিয়াম, আয়রন ও জিংক। ফুলকপির সবুজ পাতাগুলোয় রয়েছে ক্যালসিয়াম, আয়রন, আঁশ ও বিটা ক্যারোটিন। সুতরাং খোসা বা আবরণ এবং পাতাসহ সবজি রান্না আপনার খাবারে যোগ করে বাড়তি পুষ্টি। আর অবশ্যই খাবারে তেল-মসলা এড়িয়ে চলুন, যতটা সম্ভব।
সমীক্ষায় দেখা যায়, ভুল খাদ্যাভ্যাস শতকরা ৮০ ভাগ হƒদরোগ ও ৯০ ভাগ ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ফল ও শাকসবজির প্রাচুর্য রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল কমাতে ওষুধের মতো একইরকম কার্যকরী। খাদ্যাভ্যাসে আঁশযুক্ত খাবার যোগ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এর সপক্ষে প্রমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, আমাদের ‘সবজি রাজ্য’ স্রষ্টার এমন অপূর্ব সব নেয়ামতে পরিপূর্ণ, যা দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ করতে যথেষ্ট। পেঁয়াজ, রসুন থেকে শুরু করে বাঁধাকপি, বরবটি এমনকি ধনেপাতা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। প্রকৃতির এমন সব অসাধারণ উপহারগুলো অবহেলা করবেন না। চেষ্টা করুন ঘুরেফিরে সব ধরনের শাকসবজি খাওয়ার। পুষ্টি থাকবে অটুট।
ইংরেজ নাট্যকার ও লেখক জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ‘খাদ্যের প্রতি যে প্রেম, এর চেয়ে বিশ্বস্ত প্রেম আর হয় না’। বটে। কিন্তু ওটা ‘বিশ্বস্ত’ থাকে কেবল তখনই, প্রেমটা যখন হয় শাকসবজি-ফলমূলসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি। সে প্রেম আপনাকে দেবে সুস্থতা ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এক আনন্দময় দীর্ঘজীবন। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম ফল-সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে আছে শাকপাতা ১১০ গ্রাম, ফুল-ফল-ডাঁটাজাতীয় সবজি ৮৫ গ্রাম, মূলজাতীয় সবজি ৮৫ গ্রাম ও ফল ১১০ গ্রাম।
সবজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর সেভাবে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তাই সব বয়সের মানুষই শরীর সুস্থ রাখতে প্রচুর শাকসবজি খেতে পারেন।
শাকসবজি খাওয়ায় সচেতনতা বাড়ছে: তবে আরও বেশি সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে সঠিক নিয়মে শাকসবজি খাওয়ার ব্যাপারে। কারণ শুধু রান্না, সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ভুল পদ্ধতির কারণে শাকসবজি থেকে অনেকটা পুষ্টিই আমরা হারাই। ফলে প্রচুর শাকসবজিও পারে না পুষ্টিঘাটতি পূরণ করতে। তাই শাকসবজি কীভাবে খেলে অধিক পুষ্টি পাওয়া যাবে তা জানতে হবে।
যতটা পারেন কাঁচা খান: শাকসবজিতে থাকা এনজাইমর হজমে সহায়তা করে। কিন্তু বেশি রান্না করলে এই এনজাইম নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া শাকসবজি কাঁচা খেলেই বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়। কাজেই কাঁচা খাওয়া যায় এমন সবজি ও সবুজ পাতা সেদ্ধ না করাই ভালো।
গাজর, লেটুস, শসা, পেঁপে, মুলা, পুদিনা পাতা, বিট, ক্যাপসিকাম, থানকুনি, টমেটো, ধনেপাতা প্রভৃতি শাকসবজি খেতে পারেন সালাদ হিসেবে।
রান্না করতে হলে অর্ধসেদ্ধ খান: কারণ শাকসবজি যত সেদ্ধ করবেন তত এর পুষ্টিগুণের বিনাশ ঘটতে থাকবে। শাকসবজিতে থাকা বিভিন্ন অ্যামাইনো অ্যাসিড ও প্রোটিন নষ্ট হয়ে যায় বেশিক্ষণ ধরে অতিরিক্ত আঁচে রান্না করলে। তাই অল্প সময় ধরে রান্না করুন। রান্নায় যতটা সম্ভব কম পানি দিন। এতে শাকসবজির ভিটামিন ও মিনারেল অক্ষত থাকবে। আর একবার রান্না করার পর ঠান্ডা শাকসবজি দ্বিতীয়বার গরম করে খাবেন না। কারণ সবজি বারবার গরম করলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
শাকসবজি তাৎক্ষণিক রান্নার জন্য প্রস্তুতকরণ এবং পরে রান্নার জন্যে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যা খেয়াল রাখবেনÑ
শাকসবজি কেটে তারপর ধোয়ার অভ্যাস আছে বেশিরভাগ মানুষের। এটি ভুল! কারণ এভাবে কাটা শাকসবজি পানিতে ধুলে বেরিয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। তাই শাকসবজি ধোবেন অবশ্যই কাটার আগে। এতে বেঁচে যাবে মূল্যবান পুষ্টি।
আবার অনেকেই আছেন একবারে অনেক শাকসবজি কেটে ফ্রিজে রেখে দেন পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য। এটা ঠিক নয়। কারণ শাকসবজি কেটে বেশিক্ষণ রেখে দিলেও পুষ্টিমান কমে যায়।
সবজি কেমন মাপে কাটবেন তার ওপরও নির্ভর করে পুষ্টিগুণ কতটা থাকবে!
পুষ্টিবিদরা সবজিকে খুব ছোট টুকরো না করার পরামর্শ দেন। কারণ এতে সবজির প্রতিটি অংশ সরাসরি তেল ও মসলার সরাসরি সংস্পর্শে চলে আসে। ফলে নষ্ট হয় পুষ্টির একটি অংশ।
তাই রান্নার জন্য সবজি যথাসম্ভব বড় টুকরো করে কাটুন।
বেশি স্বাদ পুষ্টি বাদ: খাবারকে সুস্বাদু করতে প্রচুর তেল-মসলা ব্যবহার করেন অনেকেই। এতে স্বাদ না হয় বাড়লো, কিন্তু পুষ্টি?
আসলে অনেক তেল-ঝাল-মসলা দিয়ে রান্না করলে শাকসবজির পুষ্টিমান কমে। কাজেই পরিমিত তেল-মসলা দিয়ে একেবারে রান্না চড়িয়ে দিন। আর রান্না করুন ভালোভাবে ঢেকে। স্বাদ হয়তো কিছুটা কম পাবেন, কিন্তু বেঁচে যাবে পুষ্টির অপচয়!
সবজির খোসা ফেলে দেবেন না: কারণ ফলমূলের মতো শাকসবজিরও ভিটামিন মিনারেলসহ পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে এর খোসায়। তাই খোসা বা ত্বক যত কম ফেলা যায় তত ভালো। যে সবজি খোসাসহ খাওয়া যায় সেসব সবজি না ছিলে রান্না করুন।
খোসা ছাড়াতে হয় এমন অনেক সবজির (যেমন লাউ) খোসা ভর্তা করে খাওয়া যায়। এভাবে খেলে খাবারের অপচয়রোধের পাশাপাশি পাবেন বাড়তি পুষ্টিও।