আবুল কাসেম ভূঁইয়া : শিল্পবাণিজ্য অঙ্গনে বীমা শিল্প একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দেশের ব্যবস্যবাণিজ্য বীমা শিল্পের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং শিল্পকারখানার সমস্ত কর্মকাণ্ড সাধারণ বীমা শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিদেশ থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি করতে হলে অবশ্যই বীমা করতে হয়। শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করলে এর নিরাপত্তার জন্য অগ্নিবীমা করতে হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন বীমা শিল্পের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। এতে করে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের ভীষণ অসুবিধা হতো বীমার কার্য্যক্রম পরিচালনা করতে। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সুবিধার্থে ১৯৮৫ সালের দিকে সর্বপ্রথম বেসরকারি পর্যায়ে সাধারণ বীমা কোম্পানি খোলার অনুমতি প্রদান করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ১১টি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি ব্যবসা শুরু করে। পরে বীমা শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। ধীরে ধীরে বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধিতে এসব বীমা কোম্পানিতে বহুলোকের কর্মসংস্থান হয়। আমাদের দেশের মতো ক্ষুদ্র একটি দেশে ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির কথা ভাবাই যায় না। কারণ আমাদের দেশে স্বল্প এবং নির্ধারিত ব্যবসা নিয়ে এসব বীমা কোম্পানিগুলোয় চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। ব্যবসা সংগ্রহের জন্য বীমা কোম্পানিগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। বিশেষ করে বীমা প্রিমিয়ামের ওপর কমিশন প্রদান নিয়ে চলত তীব্র প্রতিযোগিতা। এতে করে বীমা শিল্পে এক অস্থির অবস্থা বিরাজ করছিল। দেশের বীমা শিল্পের কিছু কিছু বেসরকারি বীমা কোম্পানি আইডিআরের নির্দেশমতো ব্যবসা করলে ও অধিকাংশ কোম্পানি এসব নিয়মনীতি একদম মানত না। দেশের বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আইডিআরএ এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ নিয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর মালিকদের বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কতিপয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সমপ্রতি এ নিয়ে আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে বীমা প্রিমিয়ামের ওপর কমিশন প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বীমা প্রিমিয়ামের ওপর কমিশন প্রদান নিয়ে নোংরা প্রতিযোগিতা বন্ধের লক্ষ্যে আইডিআরএ (বীমা) উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে বীমা প্রিমিয়ামের ওপর কমিশন প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কোনো বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের আর কোনো কমিশন প্রদান করতে পারবে না। বর্তমানে এ নিয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আপাতভাবে কোনো কোম্পানি কমিশন দিচ্ছে না। বীমা গ্রাহকরা কমিশন বন্ধ হওয়ায় বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করছে। বীমা প্রিমিয়ামের ওপর কমিশন বন্ধ হওয়ায় ভালো বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এভাবে বীমা কমিশন বন্ধ হলে বীমা ব্যবসায় তীব্র প্রতিযোগিতা হবে, বীমা ব্যবসায় সেবার মান বাড়বে এবং বীমা গ্রাহকদের বীমা দাবির ব্যাপারে আর কোনো হয়রানির শিকার হতে হবে না। বীমা ব্যবসায় কমিশন প্রথা বীমা ব্যবসায় চরম ক্ষতি করেছে। এখানে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বিভিন্ন অপকর্মের প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বীমা ব্যবসা অনেকটা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। বীমা শিল্পে শৃঙ্খলা বলতে কিছুই ছিল না। অনেক বড় বড় কোম্পানি আইডিআরের নিয়ম মেনে চলতে গিয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতিগ্রস্তের সম্মুখীন হয়েছে। অনেক কোম্পানি ব্যবসা সংগ্রহ করতে না পারায় তাদের ফান্ডের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বর্তমানে কমিশন বন্ধে যে আইন করা হয়েছে, তা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটা দেখার বিষয়। এখন যদি কিছু কিছু অসাধু কোম্পানি গোপনে আগের মতো গ্রাহকদের কমিশন প্রদান শুরু করে, তবে সর্বনাশ হবে—আইডিআরের সব উদ্যেগ ভেস্তে যাবে। তাই এ ব্যাপারে আইডিআরকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, মার্কেট তদারকি করতে হবে এবং গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন প্রদানের তথ্য উদ্ঘাটন করতে হবে। তবেই সুফল মিলবে, নাহয় কোনো কিছুই হবে না। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, আইডিআরএ এ ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দেখার বিষয়। জানা যায়, কোনো বীমা কোম্পানির নিয়মবহির্ভূত কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এমনকি কোম্পানির লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। বীমা কোম্পানিগুলোর সমস্ত কার্যক্রম আইডিআরএ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারিতে থাকবে। প্রতিটি বীমা কোম্পানি শুধু তিনটি তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। বীমাকৃত বিষয়বস্তুর যথাযথ নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি তথা জাতীয় অর্থনীতিতে বীমা খাতের অবদান বৃদ্ধির স্বার্থে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কর্তৃক গৃহীত বীমা গ্রহীতাকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইডিআরএ কর্তৃক জারি করা ৬৪নং সার্কুলারের বিষয়বস্তু প্রতিপালনে জন্য সর্বসম্মতিক্রমে ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন একমত হয়। দেশের বীমা শিল্পের স্বার্থে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কারণ অতীতে গ্রাহকদের অতিরিক্ত কমিশন প্রদান করতে গিয়ে বীমা কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল। তারপরও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে বীমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত কমিশন প্রদানে বাধ্য ছিল। কিন্তু এখন সেই ধারা আর অব্যাহত থাকবে না। কমিশন প্রথা বন্ধ হওয়ায় বীমা কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হবে, বীমা শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। ভুয়া পলিসি অথবা সার্টিফিকেট প্রদান বন্ধ হয়ে যাবে এবং বীমা গ্রাহক উপযুক্ত সেবা পাবে। অতীতে অতিরিক্ত কমিশন প্রদানের কারণে অনেক বীমা কোম্পানি রিইন্স্যুরেন্স না করে বীমা দাবি পেতে বীমা গ্রাহককে হয়রানির শিকার হতে হতো। বর্তমানে তা আর হবে না। অভিজ্ঞ মহল মনে করে, দেশের বেসরকারি সাধারণ বীমা শিল্পের স্বার্থে আইডিআরএর গৃহীত পদক্ষেপগুলোহ সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এতসব কঠোর পদক্ষেপ কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে অনেকেই সন্ধিহান আছেন।
বীমা বিশেষজ্ঞ লেখক
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post