শাহারুল ইসলাম, বেনাপোল (যশোর) : নানা নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য মন্দা ও যাত্রী সংকটের মধ্যেও বেনাপোল স্থলবন্দর আবারও তার সক্ষমতার জানান দিল। গত রোববার একদিনেই ভারত বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং পাসপোর্টধারী যাত্রী চলাচল থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে, যা চলমান সংকটকালীন সময়ে ব্যতিক্রমী ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন বেনাপোল বন্দর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে মোট ৩১৪ ট্রাক পণ্যের আমদানি ও রপ্তানি হয়েছে। একইসঙ্গে চিকিৎসা, ব্যবসা, ভ্রমণ ও উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেছেন মোট ১ হাজার ৪৯৪ জন পাসপোর্টধারী যাত্রী।
গতকাল সোমবার বেনাপোল বন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) কাজী রতন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় একদিনে এই পরিমাণ ট্রাক চলাচল ও রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য। এটি বাণিজ্য সচল হওয়ার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এর আগে সর্বশেষ এমন উচ্চ রাজস্ব ও ট্রাক চলাচলের রেকর্ড দেখা গিয়েছিল ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ ৫ আগস্টের আগের সময়টিতে। তখন প্রতিদিন গড়ে ৬৫০-৭০০ ট্রাক পণ্যের আমদানি-রপ্তানি হতো এবং রাজস্ব আদায় নিয়মিতভাবে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার ঘরে থাকত। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুই দেশের একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাণিজ্য বৈঠক বন্ধ থাকায় বন্দর কার্যক্রম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। রোববারের এই বাণিজ্য কার্যক্রমকে গত এক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ হিসেবেই দেখছেন বন্দর কর্মকর্তারা।
বন্দর সূত্র জানায়, রোববার সকাল ৯টা থেকে বেনাপোল পেট্রাপোল রুটে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়। ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২৭৮ ট্রাক পণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, শিশু খাদ্য, মেশিনারিজ, অক্সিজেন, বিভিন্ন ধরনের ফল, চাল, পেঁয়াজ, মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পপণ্য।
তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তিতে সুতাসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানি সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বন্ধ রয়েছে, যা আমদানির পরিমাণ বাড়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ৩৫ ট্রাক পণ্য রপ্তানি
হয়েছে। এর মধ্যে ছিল বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন সামগ্রী, কেমিক্যাল মাছ ও ওয়ালটন ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক পণ্য। তবে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনো বেনাপোল স্থলপথে পাট, পাটজাত দ্রব্য, তৈরি পোশাক ও কাঠের আসবাবপত্রসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য আটকে আছে।
ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, রোববার ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত বেনাপোল পেট্রাপোল রুটে মোট ১ হাজার ৪৯৪ জন যাতায়াত করেন। এর মধ্যে ভারতে গেছেন ৮২১ জন এবং ভারত থেকে ফিরেছেন ৬৭৩ জন।
ভারতে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৫৯১ জন, ভারতীয় ২২৩ জন এবং অন্যান্য দেশের নাগরিক ৭ জন। ভারত থেকে ফেরত যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশি ৫৬২ জন, ভারতীয় ১০৭ জন এবং অন্যান্য দেশের নাগরিক ৪ জন। যাত্রী চলাচল থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
স্থানীয় মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, রোববার বাংলাদেশি ১০০ টাকার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৭৪ ভারতীয় রুপি। ভারতীয় ১০০ টাকায় মিলেছে ১৩৩ বাংলাদেশি টাকা। একই সময়ে ইউএস ডলারের ক্রয়মূল্য ছিল ১২৫ টাকা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা, যা সীমান্ত বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচলে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ ট্রাক পণ্য বন্দর দিয়ে যেত। এখন তা অর্ধেকেরও নিচে। এক বছর ধরে দুই দেশের বাণিজ্য বৈঠক বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। গতবছরে তার আগের বছরের তুলনায় দেড় লাখ টনের বেশি পণ্য আমদানি কমেছে।
তিনি বলেন, রোববারের এই বাণিজ্য কার্যক্রম প্রমাণ করে, পরিবেশ স্বাভাবিক হলে বেনাপোল আবারও আগের অবস্থানে ফিরতে পারে। এজন্য দ্রুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানান, বর্তমানে রেলপথে কেবল এসিআই মোটরসের আমদানিকৃত ট্রাক্টর ভারত থেকে আসছে। গতবছরের ৫ আগস্টের পর থেকে রেলে অন্যান্য পণ্যের আমদানি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢাকা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী রেল চলাচলও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post