Print Date & Time : 15 May 2026 Friday 4:08 pm

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নতুন নীতিমালা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, এয়ারলাইনস, শিপিং, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ও ট্যুর অপারেশন খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ করতে নতুন সমন্বিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এ নির্দেশনায় বিদেশ ভ্রমণ, টিকিট ইস্যু, ফ্রেইট আদায়, বিদেশে অর্থ প্রেরণ এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনায় বিস্তারিত বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুমোদন কিংবা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়া কোনো এয়ারলাইনস বা ট্রাভেল এজেন্সি আন্তর্জাতিক টিকিট ইস্যু করতে পারবে না। বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা এবং বিএমইটির ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদেশি নাগরিক, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব, ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স বা বিদেশ থেকে পাঠানো প্রিপেইড টিকিট অ্যাডভান্স (পিটিএ) ব্যবহার করে টিকিট কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে মানি চেঞ্জারের এনক্যাশমেন্ট সনদ গ্রহণযোগ্য হবে না বলে স্পষ্ট করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জাহাজকর্মীদের বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। টিকিট ইস্যুর আগে বৈধ সিডিসি, শিপিং মাস্টারের অনুমোদন এবং বিদেশি শিপিং কোম্পানির অর্থ পরিশোধের প্রমাণ যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি টাকায় কেনা আন্তর্জাতিক টিকিটের অর্থ বিদেশে ফেরত পাঠানো যাবে না; বাতিলের অর্থ স্থানীয় মুদ্রাতেই পরিশোধ করতে হবে।
বিদেশি এয়ারলাইনস ও শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদেশে মুনাফা পাঠানোর আগে স্থানীয় কর, কমিশন, পরিচালন ব্যয় ও সম্ভাব্য রিফান্ডের অর্থ সমন্বয় করতে হবে। অব্যবহƒত টিকিটের বিপরীতে অন্তত ১০ শতাংশ অর্থ সংরক্ষণ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এয়ারলাইনসগুলোকে প্রতি মাসে টিকিট বিক্রি, ফ্রেইট আদায়, রিফান্ড ও ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। অন্যদিকে শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রতি তিন মাস অন্তর ফ্রেইট, কমিশন, আয়কর ও ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে হবে। ঋঙই ও ঈঋজ ভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ফ্রেইট আদায়ে ঙঊগঝ ও ঙওগঝ সিস্টেমের বিশেষ সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় ডেমারেজ, ডিটেনশন ও হ্যান্ডলিং চার্জকে বিদেশি শিপিং লাইনের আয়ের অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কর ও কমিশন সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠানো যাবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রায় জ্বালানি ক্রয়, টিকিট বিক্রি ও ফ্রেইট আদায়ের তথ্য অনলাইন রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিদেশি বন্দর ও স্টেশনের পরিচালন ব্যয়ের জন্য পূর্বানুমতি ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবে। তবে তাদেরও নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বেসরকারি এয়ারলাইনস ও শিপিং কোম্পানিকেও বিদেশে আয়-ব্যয়ের পূর্ণ বিবরণী দাখিল করতে হবে।
বিদেশি জাহাজ ও উড়োজাহাজ চার্টারের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে। চার্টার ভাড়া পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, চার্টার চুক্তি, ব্যাংক সনদ ও আমদানি-রপ্তানি নথি যাচাই করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হলে তা দেশে ফেরত আনার লিখিত অঙ্গীকার নিতে হবে।
কুরিয়ার সার্ভিস, রেলওয়ে কোম্পানি ও বিদেশি এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন হিসাব ও রিপোর্টিং বিধান চালু হয়েছে। কমিশন, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠানো যাবে, তবে তার আগে নির্ধারিত ফরমে হিসাব ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ জমা দিতে হবে।
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের জন্য বলা হয়েছে, লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋঙই ভিত্তিক রপ্তানির ক্ষেত্রে টাকায় ফ্রেইট পরিশোধ করতে পারবে। তবে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে হবে এবং নির্ধারিত ‘এফএফ’ ফরম ব্যবহার বাধ্যতামূলক থাকবে।
এছাড়া শিপিং কোম্পানি, এয়ারলাইনস ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব হিসাবে রপ্তানি ও আমদানিজনিত বৈদেশিক আয় জমা রাখা এবং বিদেশি ব্যয় পরিশোধ করা যাবে। তবে প্রতিটি লেনদেন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
ট্যুর অপারেটরদের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান আনা হয়েছে। একজন ভ্রমণকারী তার বার্ষিক ভ্রমণ কোটার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ ব্যবহার করে ট্যুর প্যাকেজ কিনতে পারবেন। বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ট্যুর অপারেটরদের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা হবে এবং এর বড় অংশ স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করতে হবে। পাশাপাশি মোট বিক্রির অন্তত ২৫ শতাংশ ইনবাউন্ড ট্যুর প্যাকেজ হতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি শাখা, প্রতিনিধি ও লিয়াজোঁ অফিসের জন্যও নতুন রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে এবং সব বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, নতুন এ নির্দেশনার ফলে আন্তর্জাতিক পরিবহন, পর্যটন, এয়ারলাইনস ও শিপিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে।