Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 10:06 am

বৈষম্যমুক্তি যে আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থাকছে

আজিজুল পারভেজ:  বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মাইলফলক ঘটনা ‘সত্তরের নির্বাচন’, অর্থাৎ ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে একটি পোস্টার আলোড়ন তোলে-শিরোনাম ‘পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন?’ এখানে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি হিসেবে আওয়ামী লীগ বৈষম্য বিলোপের বিষয়টিই সামনে আনে। আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল পাকিস্তানের সম্পদশালী ২২ পরিবারের খপ্পর থেকে মুক্তি।

সে নির্বাচনে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ‘পাকিস্তান না থাকলে ইসলাম থাকবে না’ কিংবা ‘পূর্ব পাকিস্তান ভারতের খপ্পরে চলে যাবে’-এমন বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধেই রায় দেয়। নির্বাচনে গণরায়ের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্র শুরু করলে পূর্বপাকিস্তান কর্মসূচি ঘোষণা করে। যার পরিণতিতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।

এই সংগ্রামের পথে আরেকটি মাইলফলক ঘটনা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ। ওই ভাষণে তিনি পরপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাক্য উচ্চারণ করেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এখানে তিনি মুক্তি বলতে অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তির কথাই জানিয়ে দিয়েছেন।

বৈষম্যমুক্তির এই আকাঙ্ক্ষা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও স্থান দেওয়া হয়। ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা’ করা হয়। বাংলাদেশ সংবিধানে এই ঘোষণাপত্র স্থান পেয়েছে। কিন্তু সংবিধানে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটি আইনের মাধ্যমে আদালতে দাবি করা যাবে না।

ফলে যা হবার তা-ই হয়েছে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে দায়মুক্ত রাষ্ট্রে আজ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসে আমরা কী দেখছি? যে বৈষম্যমুক্তির আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই ঘোষিত হলো, যে বৈষম্য নিরসনের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করল, সেই দেশে মানুষে-মানুষে বৈষম্য বিলোপ তো হলো না বরং ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কিছু মানুষ যখন যেনতেনভাবে বিপুল সম্পদ অর্জন ও আত্মসাৎ করছে, তখন অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিপুল মানুষ নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুক্তি তো আসেইনি, বরং এখন শোষকের আসনে এসে বসে গেছে বিজাতীয়দের বদলে সজাতির মানুষ। ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ যেন কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে মানুষের কোনো মূল্যই নেই। মানুষ যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। সংখ্যা হিসেবেই কেবল মানুষের অস্তিত্ব আছে।

অর্থনৈতিক-সামাজিক এ বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করার কারণে মানুষ বারবার ফুঁসে উঠেছে। স্বাধীনতা লাভের কুড়ি বছরের মাথায় ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। জবাবদিহির অভাব, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, বাকস্বাধীনতা, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ছিল মুখ্য বিষয়। এরপর ২০২৪ সালে এসে আরেকবার তরুণদের নেতৃত্বে আবারও গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো। চাকরির  ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রতিবাদে ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ হিসেবেই পরিচিতি পায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের লোপাট, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়াও একটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। অর্থাৎ এ দেশের মানুষ বৈষম্য নিরসনের স্বপ্ন নিয়ে বারবার রাজপথে নেমে আসছে। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার তাড়না থেকে বারবার রাস্তায় নামছে। সময়ে সময়ে মানুষ জেগে উঠছে। রক্ত দিয়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু পরিবর্তনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

কেবল আমাদের নয়, বিশ্ব-ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব যেখানে যত বিদ্রোহ, বিপ্লব, অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে তার মূলেও রয়েছে স্বাধীনতাহীনতা ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস। প্রতিটি সংগ্রামের পেছনে বৈষম্যমুক্তির স্লোগানই হয়ে উঠেছে প্রধান প্রেরণা। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব সৃষ্টিকারী ফরাসি বিপ্লবের প্রেরণাই ছিল ‘স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী’। সাম্যবাদী দার্শনিক কার্ল মার্কসের একটি উক্তি আছে-‘The history of all hitherto existing society is the history of class struggles.” অর্থাৎ সমাজের ইতিহাস মূলত শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস-অর্থনৈতিক বৈষম্যকে তিনি সামাজিক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হিসেবে দেখেছেন।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বক্তব্য উদ্ধৃত করতে পারি। এই রেহমান সোবহানই বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনের সময় আমরা সব সময় বিশ্বাস করতাম, যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছিলাম, তার অধীনে থাকার চেয়ে বাংলাদেশ তার নিজের জনগণতান্ত্রিক শাসনে অনেক ভালো করবে। আমাদের প্রত্যাশা অনেকাংশেই পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি পাকিস্তানের চেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে, স্বাধীনতার সময় যেসব জায়গায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম, তার প্রতিটিতে আজকে আমরা এগিয়ে। এর মধ্যে মাথাপিছু আয়, জিডিপি, রপ্তানি, সর্বস্তরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, গড় আয়ু, দারিদ্র্যবিমোচন সবকিছু রয়েছে। সব পর্যাস্কেব্যবসা, আমাদের কঠোর পরিশ্রমী কৃষক, নারী, অভিবাসী ও সুশীল সমাজের গোষ্ঠীগুলোর মঞ্চেআমরা উদ্যোক্তা তৈরি করেছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম ডিজিটাল বিপ্লব ও সংস্কৃতির জগতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে লোভের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার কারণে আমাদের উন্নয়নের সুফল চলে গেছে কিছু মানুষের হাতে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা বেড়েছে। দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতাও বেড়েছে। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট একদল ব্যবসায়ী আমাদের সব প্রতিষ্ঠান দখল করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু যে সমতাভিত্তিক, শোষণ-বঞ্চনাহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এ ধরনের একটি বৈষম্যমূলক সমাজের উত্থান তার সম্পূর্ণ বিপরীত।’

এই অবস্থায় আমাদের এখন প্রয়োজন বৈষম্য বিলোপ করে ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জোরদার করা। পাকিস্তানের দুই অর্থনীতি তত্ত্বের আরেক প্রচারক ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম। ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর The Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS)-এর এক সেমিনারে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক অসমতা বা বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির টেকসইতা হুমকির মধ্য ফেলে দিতে পারে।’

আমাদের রাষ্ট্রের বৈষম্যের পরিসংখ্যানগত চিত্রটি আমরা দেখে নিতে পারি। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুসারে, দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। আর অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৬ শতাংশ। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। কিন্তু এরপর এই হার আরও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার ‘স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনের সময় আমরা সব সময় বিশ্বাস করতাম, যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছিলাম, তার অধীনে থাকার চেয়ে বাংলাদেশ তার নিজের জনগণতান্ত্রিক শাসনে অনেক ভালো করবে। আমাদের প্রত্যাশা অনেকাংশেই পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি পাকিস্তানের চেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে স্বাধীনতার সময় যেসব জায়গায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম, তার প্রতিটিতে আজকে আমরা এগিয়ে। তবে লোভের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার কারণে আমাদের উন্নয়নের সুফল চলে গেছে কিছু মানুষের হাতে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা বেড়েছে। দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতাও বেড়েছে। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট একদল মানুষ আমাদের সব প্রতিষ্ঠান দখল করে নিয়েছে। যে সমতাভিত্তিক, শোষণ-বঞ্চনাহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এ ধরনের একটি বৈষম্যমূলক সমাজের উত্থান তার সম্পূর্ণ বিপরীত। -অধ্যাপক রেহমান সোবহান অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) একটি সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশে। একই সঙ্গে, অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুসারে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা চার কোটির উপরে। অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজন এখন গরিব। পিপিআরসির সমীক্ষা অনুসারে, দরিদ্রের বাইরে এখন দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় ধরে দারিদ্র্য পরিমাপ করে বিবিএস। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, ওই টাকা আয় করতে না পারলেই ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে মাসিক মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৫০ টাকা হলে নিম্ন দারিদ্র্যসীমা এবং ৩ হাজার ৮৩২ টাকা হলে মোট দারিদ্র্যসীমা ধরা হয়।

১৯৯১-৯২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬.৭ শতাংশ। এরপর এই হার কমতে শুরু করেছিল এবং এই কমানোটাকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল। হিসাব বলছে, দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ এখন দারিদ্র্যসীমার ওপরেই আছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের সিংহভাগ মানুষই জীবনযাপনের ক্ষেত্রে হিমশিম খাচ্ছে। পিপিআরসির গবেষণা বলছে, দেশের ৮০ শতাংশ পরিবার সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। ৪০ শতাংশ পরিবারের গড় আয় ১৪,৮৮১ টাকা, যেখানে খরচ ১৭,৩৮৭ টাকা। ঋণের ওপর নির্ভরশীল ৫২ শতাংশ পরিবার, যাদের এক-তৃতীয়াংশ সংসার খরচ মেটাতে ঋণ নেয়। বিবিএসের খানা জরিপের তথ্য থেকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের চিত্র স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। জাতীয় স্তরের গিনি সহগ

২০২৪ সালে এসে আরেকবার তরুণদের নেতৃত্বে আবারও গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো। চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রতিবাদে ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ হিসেবেই পরিচিতি পায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের লোপাট, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়াও একটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। অর্থাৎ এ দেশের মানুষ বৈষম্য নিরসনের স্বপ্ন নিয়ে বারবার রাজপথে নেমে আসছে। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার তাড়না থেকে বারবার রাস্তায় নামছে। সময়ে সময়ে মানুষ জেগে উঠছে। রক্ত দিয়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু পরিবর্তনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

(মানুষের আয় বা সম্পদের বৈষম্য পরিমাপের পরিসংখ্যানগত সূচক) যা ২০১০ সালের ০.৪৫৮ থেকে ২১৬ সালে দাঁড়ায় ০.৪৮২। ২০২২ সালে দাঁড়ায় ০.৪৯৯। যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম উচ্চ।

আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো আখতার ইউ আহমেদ খানা জরিপের তথ্য থেকে পালমা অনুপাত (একটি দেশের আয়বৈষম্য পরিমাপের একটি অর্থনৈতিক সূচক; মোট জনসংখ্যার সবচেয়ে সম্পদশালী ১০ শতাংশের আয় এবং সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের মধ্যকার আয়-অনুপাত) দিয়েও দেখিয়েছেন যে, ২০২২ সালে জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে সম্পদশালী ১০ শতাংশ বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ ভোগ করেছেন অথচ সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের ভাগ্যে মাত্র প্রায় ১৩ শতাংশ পড়েছে। পালমা অনুপাতটি ২০১৬ সালের ২.৯ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে দাঁড়ায় ৩.২-এ। আরেক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের ৫ শতাংশ মানুষের কাছে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৫১.৩২ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান বাংলাদেশের আয়বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগামী প্রবণতারই প্রমাণ দেয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রয়েছে বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক বৈষম্য। এই বৈষম্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও নৈতিক-বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত। আয় ও সম্পদের অসমতা তার প্রধান প্রকাশ হলেও শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, বিচারপ্রাপ্তি এবং পরিবেশগত ন্যায়ের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। গ্রাম-শহরের ব্যবধান, নারীর ওপর জুলুম ও বঞ্চনা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সংকট-এসব বাস্তবতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বিভাজনকে আরও গভীর করছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে যে অনাচারের জন্ম দিচ্ছে তার প্রকাশ কিছু কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়তই ফুটে উঠছে। সংসার চালাতে না পেরে নিজ হাতে সন্তানদের হত্যা করে পিতা-মাতার আত্মহত্যার খবর প্রায়ই আসে সংবাদপত্রে। একটা মানুষ কখন নিজ সন্তানের হন্তারক হয়, এটা মানবিক মানুষ মাত্রেই উপলব্ধি করতে পারেন। স্বীকার না করলেও ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ে বৈষম্যও বিরাজ করছে সমাজ ও রাষ্ট্রে। বিশেষ করে চাকরির ক্ষেত্রে এ সংকট বিদ্যমান। সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্য এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। সমান শ্রম দিয়েও একজন নারী শ্রমিক পুরুষের সমান পারিশ্রমিক পান না।

মৌলিক অধিকারগুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখব, বিষয়গুলো ‘যার যার তার তার’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার টাকা আছে সে-ই কেবল প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে পারছে, যার নেই সে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষা রীতিমতো পণ্যে পরিণত হয়েছে। যার অর্থ আছে সে মানসম্পন্ন শিক্ষা ক্রয় করতে পারছে। নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে। প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারছে। সরকারি ব্যবস্থায় যারা শিক্ষা গ্রহণ করে তারা জীবনের ১৫-১৬ বছর ব্যয় করেও কোনো কর্মক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্রও একই। টাকা থাকলে চিকিৎসা মেলে। না থাকলে যে চিকিৎসা পাবেন, তাতে ভরসা রাখা যায় না। চিকিৎসা ব্যয় সইতে না পেরে সন্তান বাঁচাতে পিতা, কিংবা পিতা-মাতাকে বাঁচাতে শিশুদের ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়। এসব দৃশ্যও এখন আর কারো অনুভূতি স্পর্শ করে না। আমাদের দেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেই। জনসংখ্যার মধ্যে আবার তরুণ জনগোষ্ঠী সংখ্যানুপাতে বেশি। এটি একটি সম্ভাবনার দিক। কিন্তু সঠিক উদ্যোগের অভাবে অপচয় হচ্ছে। তারুণ্যের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানোর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব প্রকট। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এই অবস্থায় আমাদের অদম্য তরুণরা জীবন বাঁচাতে, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে উন্নত দেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য মহাসমুদ্রে ঝাঁপ দিতেও কার্পণ্য করছে না।

আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর বৈধপথে ১০-১২ লাখ তরুণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বিদেশে যায়। এদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনশক্তিতে পরিণত করার কিছু উদ্যোগ নামমাত্র থাকলেও তা কার্যকর নয়। অথচ দেশের চালিকাশক্তির অন্যতম হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এই রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই দেশ বৈশ্বিক মন্দা থেকে এমনকি করোনা মহামারির সংকট থেকেও রেহাই পেয়ে গেছে।

কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলেও এ ব্যবস্থাও অবহেলিত। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, গাঙ্গেয় বদ্বীপের মাটি এমনই ফলনশীল যে বীজ মাটিতে পুঁতে দিলে সামান্য পরিচর্যা করলেই ফসল মেলে। অথচ আমাদের দেশের কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। সঠিক সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠার কারণে বিপুল সম্পদের অপচয় হচ্ছে প্রতি বছর।

সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি চলছে লাগামহীনভাবে। বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলেছে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দুর্নীতিকে ‘ফুলস্টপ’ বলার মতো সাহসী নেতৃত্ব এখনো আসেনি। ‘দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স’ বিভিন্ন সময় নেতা-নেত্রীদের মুখে শোনা গেলেও তা কেবলই মুখের বুলিতে পরিণত হয়েছে। কার্যক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। দুর্নীতিকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনার কথা কখনো কখনো বলা হয়। এর মাধ্যমে আসলে প্রচলিত ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেওয়া হয়। পরিবহন সেক্টরের বিদ্যমান চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া অর্থ চাঁদাবাজি নয়’ বলে মন্ত্রী যখন মত দেন, তখন সারা দেশের চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট বৈধতা পেয়ে যায়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্বৃত্তায়নও সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। ন্যায়ের শাসন তো দূরের কথা আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠিত নয়। আইন চলে ক্ষমতাবানদের ইশারায়। দুর্বলের ওপর সবলের শাসন চলেছে। সমাজে মূল্যবোধের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। একইভাবে সমাজে নৈতিকতার সংকটও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক সময় ‘ঘুষখোর’, ‘দুর্নীতিবাজ’দের সঙ্গে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করত না, মেয়ে বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করত না। এখন আর এসব ধর্তব্যের বিষয় হয় না।

পাকিস্তান আমলে সম্পদশালী ‘২২ পরিবার’ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন নিয়ে আলোচিত একটি ঐতিহাসিক ইস্যু ছিল। পাকিস্তানের শিল্পসম্পদের প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং ব্যাংকিং ও বিমা খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পদ এই ২২টি ধনী শিল্পপতি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে আলোচিত হয়। সেই ২২ পরিবারের স্থলে এখন বাংলাদেশে কত পরিবার তৈরি হয়েছে? এ পরিসংখ্যান কোথাও পাওয়া যায় না। আমরা যদি ধরে নিই তারা কোটিপতি ছিলেন; তাহলে বলতে হয়, এখন দেশে শতকোটিপতি ছাড়িয়ে হাজারকোটিপতি গড়ে উঠেছেন কিছুদিন পরপরই দেশের কোটিপতিদের সংখ্যা জানা যায়। বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৫ জন। ১৯৭৫ সালে ছিল ৪৭ জন। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮টি। ১৯৯০ সালে হয়ে যায় ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি এবং ২০০৮ সালে ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালে ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বেড়ে এক লাখ এক হাজার ৯৭৬টিতে পৌঁছায়। ২০২২ সালে এক লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি, ২০২৩ সালে এক লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি এবং ২০২৪ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় এক লাখ ২১ হাজার ৩৬২টিতে। ২০২৫ সালে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জুন প্রান্তিক শেষে এক কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত রয়েছে-এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল এক লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৭০টিতে।

অর্থাৎ তিন মাসে কোটিপতি হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৭৩৪টি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য করে কেউ কোটিপতি হবে এতে তো দোষের কিছু নেই। কিন্তু এই সম্পদ অর্জনের পেছনে ব্যবসা-বাণিজ্য নাকি রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট কাজ করছে সেখানেই আসল প্রশ্ন। তার ওপর আরেক প্রশ্ন হচ্ছে-আমরা তো দেখছি যারা ব্যাংকে টাকা রাখছে তাদের হিসাব। যারা টাকা দেশে না রেখে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে, তারা কত টাকার মালিক সে হিসাব তো অজানাই থেকে যাচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী এমপিদের মধ্যে ৮০ শতাংশই হচ্ছেন কোটিপতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন অনুসারে, নির্বাচিত কোটিপতি এমপির সংখ্যা ২৩৬ জন। তাদের মধ্যে শতকোটিপতি রয়েছেন ১৩ জন। অবশ্য সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলছে, নবনির্বাচিত এমপিদের ৯০ শতাংশের বেশি কোটিপতি। তাদের পরিসংখ্যান মতে, ২৯৭ জন এমপির মধ্যে ১৪৭জনই ঋণগ্রহীতা। এদের মধ্যে ঋণখেলাপি কত জন সেই হিসাব দিতে পারেনি সুজন। তবে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দৈনিক সমকালের রিপোর্ট অনুসারে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অন্তত ৪৫ ঋণখেলাপি প্রার্থী এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। তাদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন। ব্যাংকে রক্ষিত জনগণের টাকা মেরে দেওয়ার অভিপ্রায় যাদের মধ্যে কাজ করে তারা যখন রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়ে যান তখন দেশের সম্পদের হেফাজত কতটুকু হবে তা সহজেই অনুমেয়।

এত সব হতাশার চিত্র তুলে ধরার পরও এটা স্বীকার করতে হবে আমাদের দেশটা অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত উন্নয়নশীল একটি দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্বাধীনতার পর গত প্রায় সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশ প্রায় সব ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যে বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন সেই দেশটি ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক সূচক যেমন গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু হার হ্রাস, সন্তান প্রজননের হার হ্রাস, শিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীর সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধি, কৃষি নির্ভরতা থেকে শিল্পে রূপান্তরের প্রয়াস, খাদ্য-শস্য-মৎস্য উৎপাদনে প্রায় স্বাবলম্বিতা অর্জন, উন্নয়নশীল দেশের পথে উত্তরণ প্রভৃতি অগ্রগতিকে সাফল্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

দেশের জনসংখ্যা যখন সাত কোটি ছিল তখন খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, আর এখন সতেরো আঠারো কোটি মানুষের খাবার উৎপাদনের প্রায় সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু শিবির পরিচালনা করছে বাংলাদেশ। তেরো লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এক সময় বাজেট প্রণয়নের আগে দেশের অর্থমন্ত্রী বিদেশে গিয়ে টাকার জন্য ধরনা দিতেন। বিদেশি সাহায্যেই প্রণীত হতো বাজেট। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আগে শতভাগ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো বৈদেশিক অনুদান থেকে। এখন প্রায় ৬৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয় দেশীয় সম্পদ থেকে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, দেশ-বিদেশের প্রায় সব বিশেষজ্ঞেরই ধারণা ছিল-বাংলাদেশ কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। প্রচলিত উন্নয়ন তত্ত্বগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে ক্রমশ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের তথ্যের ভিত্তিতেই নাম লিখিয়েছে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। দূরন্ত গতিতে এগিয়ে চলছে উন্নত দেশ হওয়ার পথে। এখন প্রয়োজন বৈষম্য বিলোপ করে ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।