দেশের ব্যাংক খাতে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির চাপে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একটি শক্তিশালী ‘ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা তহবিল’ গঠন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শাহ্জালাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ। তিনি মনে করেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পুরো আর্থিক খাত আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
শেয়ার বিজ : ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের (এনপিএল) উচ্চহার এবং মূলধন ঘাটতি দীর্ঘ স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের আর্থিক ভিত মজবুত করতে কি একটি সুনির্দিষ্ট ‘ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা তহবিল’ বরাদ্দ করা জরুরি বলে মনে করেন?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের যে বাস্তব চিত্র উঠে আসছে, তাতে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) এবং মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ‘ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা তহবিল’ বা সমমানের উদ্যোগ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ২৩টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি রেকর্ড ২.৮২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় শুধু প্রথাগত বাজেট বরাদ্দ নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
কেন এই তহবিল বা বিশেষ উদ্যোগ জরুরি?
বিশাল মূলধন ঘাটতি: রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি মিলিয়ে ২৩টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য ‘অশনি সংকেত’।
খেলাপি ঋণের চরম পর্যায়: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আমানতকারীদের আস্থা: ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং মূলধন ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমানতকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে, যা ‘ব্যাংকরান’-এর ঝুঁকি তৈরি করে।
সংস্কারের জন্য অর্থের প্রয়োজন: বিশ্বব্যাংকের মতে, ব্যাংক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে জিডিপির অন্তত ১০ শতাংশ বা প্রায় ৫.৫ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকার নতুন মূলধন বা সহায়তা প্রয়োজন।
শেয়ার বিজ: বাজেটে কী ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাশিত?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি ‘রেজল্যুশন ফান্ড’ বা ব্যাংক উদ্ধার তহবিল তৈরির পরিকল্পনা করছে, যা ব্যাংকগুলোর বার্ষিক আমানতের ওপর ০.২৫% প্রিমিয়ামের মাধ্যমে গঠিত হবে। বাজেটে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন:
১. দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন : শুধু টাকা দেওয়া নয়, বরং ভঙ্গুর ব্যাংকগুলোকে একত্রীকরণ বা মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে পুনর্গঠন করার জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও তহবিল রাখা।
২. ব্যাংক আমানত বীমা বৃদ্ধি: আমানতকারীদের আস্থাফে রাতে বীমার কভারেজ বাড়ানো।
৩. সুশাসন নিশ্চিত করা: অর্থ পাচার ও বেনামি ঋণ বন্ধে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করা।
৪. অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (বিএএমসিও): খেলাপি ঋণগুলোকে আলাদা করে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে সক্রিয় করতে তহবিল বরাদ্দ করা।
শেয়ার বিজ: বিগত বছরগুলোয় আর্থিক খাতে অর্থ পাচার ও সুশাসনের অভাবের কারণে খেলাপি ঋণ আদায় কঠিন হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ‘অ্যাসেট রিকভারি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতে আপনারা কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন।
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: বিগত বছরগুলোয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব ও অর্থ পাচারের ফলে খেলাপি ঋণ আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এই পরিস্থিতি উত্তরণে একটি কার্যকর ‘অ্যাসেট রিকভারি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে:
সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠন: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মন্দ বা খেলাপি ঋণ (এনপিএল) আলাদা করে দ্রুত আদায়ের জন্য বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা অ্যাসেট রিকভারি কোম্পানি (এআরসি) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইনি কঠোরতা ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল: অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করা এবং খেলাপিদের সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
ফরেনসিক অডিট ও সম্পদ অনুসন্ধান: ইচ্ছাকৃত খেলাপি এবং অর্থ পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে ফরেনসিক অডিট এবং তাদের লুকানো সম্পদ খুঁজে বের করার জন্য আইনি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এনডিআর): মামলার জট কমাতে মধ্যস্থতা বা সালিশের মাধ্যমে ব্যাংক ও গ্রাহকের সমঝোতায় ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা: ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ‘কানেক্টেড লোন’ বা ঋণের নামে অর্থ পাচাররোধে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ঋণ পুনঃতফসিল ও ওয়ান-টাইমসে টেলমেন্ট (ওটিএস): প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ এবং ওয়ান-টাইমসেটেলমেন্ট স্কিমের মাধ্যমে দ্রুত বকেয়া আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।
শেয়ার বিজ : আগামী বাজেটে সরকারের কাছ থেকে আপনারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন সংস্কারটি প্রত্যাশা করেন?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষ এবং অর্থনীতিবিদরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। এছাড়া কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।
আগামী বাজেটে যেসব সংস্কার বেশি প্রত্যাশিত:
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধ্যের মধ্যে আনা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের নিচে না মিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংক খাতের দুর্দশা দূর করা এবং কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের দক্ষতা বৃদ্ধি।
কর কাঠামো ও রাজস্ব আদায়: রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কর দাতার ওপর চাপ না বাড়িয়ে কর জাল বাড়ানো এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ং ক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা।
কর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তা: নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।
কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা: প্রান্তিক কৃষকের জন্য সহজে কৃষি ঋণ, কৃষি বিমা চালু এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকটের এই সময়ে, উন্নয়ন বাজেটের গুণ গতমান নিশ্চিত করে অর্থ পাচাররোধ করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
শেয়ার বিজ: ঋণের বিপরীতে রাখা প্রভিশনের সম্পূর্ণ কর ছাড়ের সুবিধা আপনাদের স্থিতিপত্রে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: ঋণের বিপরীতে রাখা প্রভিশনের ওপর সম্পূর্ণ কর ছাড়ের সুবিধা একটি ব্যাংকের স্থিতিপত্রে (ব্যালেন্স শিট) অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি মূলত ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এর প্রধান ইতিবাচক প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
নিট মুনাফা বৃদ্ধি: যখন প্রভিশন সম্পূর্ণ কর যোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়া হয়, তখন ব্যাংকের কর প্রদানের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে নিট মুনাফা বৃদ্ধি পায়।
সঞ্চিতি সংরক্ষণে উৎসাহ ও মূলধন বৃদ্ধি: সম্পূর্ণ কর ছাড়ের সুবিধা থাকলে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখতে উৎসাহিত হয়। এটি ব্যাংকের ‘প্রভিশন ফর লোন লসেস’ বা রিজার্ভ বাড়ায়, যা ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি বা মূলধন হিসেবে গণ্য হয়।
স্থিতিপত্রের স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি হ্রাস: এটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে এবং স্থিতিপত্র আরও স্বচ্ছ হয়।
তারল্য সংকট নিরসন: কর ছাড়ের মাধ্যমে ব্যাংকের হাতে বেশি নগদ অর্থ থাকে, যা ব্যাংক পুনরায় বিনিয়োগ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করতে পারে, যা ব্যাংকের সামগ্রিক তারল্য বাড়ায়।
শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা: বেশি নিট মুনাফা এবং শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাংকের ওপর আস্থা বাড়ায়।
শেয়ার বিজ: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমে যাওয়ার এই সময়ে বাজেটে কী ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, অথচ এই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে (প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি) নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যাপক ব্যাংক-নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব তৈরি করতে পারে, অর্থাৎ ব্যাংকগুলো আমানতের বড় অংশ সরকারকে ঋণ হিসেবে দিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে নিম্নলিখিত সুরক্ষা মূলক ব্যবস্থাগুলো থাকা প্রয়োজন:
১. রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যাংক-নির্ভরতা হ্রাস
কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি: এনবিআরের কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং কর জাল বিস্তৃত করে ব্যাংক-নির্ভরতা কমাতে হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি করের আওতায় আনা: দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিকে করের আওতায় এনে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করা।
ব্যয় সংকোচন: উন্নয়ন প্রকল্পে কাটছাঁট এবং অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি কমিয়ে ব্যাংকের ওপর চাপ কমানো।
২. বেসরকারি খাতের জন্য তারল্য সুরক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল: সরকার থেকে ব্যাংকগুলোকে শিল্প ও কলকারখানা সচল রাখতে স্বল্প সুদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (যেমন ফ্যাক্টরি রিভাইভাল ফান্ড) চালু রাখা।
খেলাপি ঋণ কমানো: ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, যা ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে।
এসএমই ও কৃষিতে বিশেষ গুরুত্ব: কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ কোটা বা গ্যারান্টি স্কিম চালু রাখা।
৩. আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পদক্ষেপ
টাকা ছাপিয়ে ঋণ বন্ধ: কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে সরকারের ঋণগ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। কারণ এটি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়।
বৈদেশিক ঋণের সঠিক ব্যবহার: উচ্চ সুদের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিবর্তে কম সুদের বৈদেশিক ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়ানো।
সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা: ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় পত্র বা বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া।
৪. নীতি সহায়তায় বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার
শিল্পায়নে সহায়তা: তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা বা শুল্ক ছাড় দেওয়া।
সুদের হারের সুষম ব্যবস্থাপনা: সরকারি বন্ডে উচ্চ সুদের (প্রায় ১১%) কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাই সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের হার বাজার অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা; যাতে সরকারি খাতের জন্য ‘আকর্ষণীয় বিকল্প’ না হয়ে ওঠে।
শেয়ার বিজ: ব্যাংকগুলোকে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো (যেমন কিউআর কোড ইন্টার অপারেবিলিটি বা ডিজিটাল ব্যাংকিং) উন্নয়নে বাজেটে কী ধরনের বরাদ্দ বা নীতিসহায়তা প্রয়োজন?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো (কিউআর কোড ইন্টার অপারেবিলিটি, ডিজিটাল ব্যাংক) উন্নয়নে বাজেটে স্মার্টকার্ড ও পিওএস মেশিনের ওপর শুল্ক হ্রাস, ডিজিটাল লেনদেনে প্রণোদনা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া ফিনটেক ও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ইন্টার অপারেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে নীতিসহায়তা জরুরি।
বাজেট ও নীতি সহায়তার মূল দিকগুলো:
পণ্য ও সেবার ওপর শুল্কহ্রাস: স্মার্টকার্ড এবং পিওএস মেশিনের ওপর বিদ্যমান উচ্চশুল্ক ১৫%-এর নিচে নামিয়ে আনা, যা ডিজিটাল পেমেন্ট অব কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
ডিজিটাল লেনদেনে প্রণোদনা: ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে উৎসাহিত করতে গ্রাহকদের জন্য এবং মার্চেন্টদের জন্য প্রণোদনা বা ইনসেন্টিভ কাঠামো চালু করা।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং (এমএল) ব্যবহার করে জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত বরাদ্দ দেওয়া।
কিউআর কোড ইন্টার অপারেবিলিটি: সব ব্যাংকের মধ্যে কিউআর কোড লেনদেন সুসংহত করতে ‘বিনিময়’ বা সমমানের প্ল্যাটফর্মের আধুনিকায়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
ডিজিটাল ব্যাংক ও ফিনটেক: ডিজিটাল ব্যাংক, ভার্চুয়াল কার্ড এবং ডিজিটাল ওয়ালেট সেবার প্রসারে নীতিগত সহায়তা প্রদান করা।
প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং: সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে ফিনটেক ব্যবহারের দ্রুত বাস্তবায়নে নির্দেশিকা এবং প্রযুক্তি গত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বরাদ্দ।
শেয়ার বিজ: বেসরকারি বা বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো কী কী?
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ: ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং ল্যান্ডস্কেপে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো মূলত ডিজিটাল উদ্ভাবন, সুশাসন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার ওপর জোর দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের মূল কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং উদ্ভাবন
ওপেন ব্যাংকিং ও ফিনটেক পার্টনারশিপ: ওপেন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের সেবা একই প্ল্যাটফর্মে এনে কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স উন্নত করা। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো।
ডিজিটাল লোন ও পেমেন্ট: ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য ডিজিটাল লোন সুবিধা এবং গ্রামগঞ্জে ও ‘বাংলাকিউআর’-এর ব্যবহার বাড়িয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলা।
সাইবার নিরাপত্তা ও দক্ষতা: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা নিরাপত্তা জোরদার করা।
২. প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসার: প্রথাগত শাখার পরিবর্তে কম খরচে
দূরবর্তী এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিং ও সাব-ব্র্যাঞ্চের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা প্রদান।
নতুনদের জন্য অ্যাকাউন্ট: ‘নো-ফ্রিলস’ বা শূন্য ব্যালেন্সের অ্যাকাউন্ট এবং প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে
প্রান্তিক জনগণকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা।
নারী ও যুব উদ্যোক্তা: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ এবং স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যুব সমাজকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা।
৩. সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
ক্স রিস্কভিত্তিক তত্ত্বাবধান (আরবিএস): বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা কার্যকর করা, যা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
ড়োবৎহধহপব সংস্কার: পরিচালনা পর্ষদ ও ঝুঁকি কমিটিকে শক্তিশালী করা এবং দুর্বল ঋণ (এনপিএল) কমানোর জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
সতর্কতা মূলক ঋণ দান: শুধু বড় করপোরেট ঋণের ওপর নির্ভর না করে এসএমই এবং ক্যাশফ্লো-ভিত্তিক ঋণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
৪. গ্রাহক সেবা ও প্রতিযোগিতামূলক কৌশল
দ্রুত ও ব্যক্তিগত সেবা: প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ঋণ অনুমোদন এবং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য ডিজাইন করা।
আমানত ও রেমিট্যান্স: প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দ্রুত রেমিট্যান্স সেবা এবং আকর্ষণীয় সঞ্চয় প্রকল্প চালুর মাধ্যমে আমানত ভিত্তি শক্ত করা।
দক্ষ জনবল: ব্যাংকিং খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করা।
