Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 4:19 am

ভবিষ্যতের বীজতলা-ইউজিসির গবেষণা অনুদান ও কিছু জরুরি সংস্কার

হাসান শিরাজী: ধরুন, দেশের কোনো এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক শফিক। রাতের পর রাত জেগে ল্যাবে কাজ করে তিনি পাটের আঁশ থেকে এমন এক ধরনের পলিথিন তৈরির উপায় বের করেছেন, যা মাত্র এক মাসেই মাটিতে মিশে যায়। পরিবেশের জন্য এ এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হতে পারে। কিন্তু এই আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে দরকার বড় পরিসরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর তার জন্য প্রয়োজন টাকা।
অনেক আশা নিয়ে শফিক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর কাছে গবেষণার অনুদান বা ফান্ডের জন্য আবেদন করলেন। এরপর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। মাসের পর মাস কেটে যায়। ফাইলের পর ফাইল ঘোরে, কিন্তু ফান্ড আর আসে না। একসময় শফিক জানতে পারলেন, তার চেয়ে অনেক সাধারণ এবং পুরোনো একটি বিষয়ের ওপর গবেষণা করার জন্য বিশাল অঙ্কের অনুদান পেয়ে গেছেন অন্য এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, যার হয়তো ওপর মহলে ভালো জানাশোনা আছে। হতাশ হয়ে একসময় ল্যাবে যাওয়া কমিয়ে দিলেন শফিক। পাটের পলিথিনের স্বপ্নটা হয়তো কোনো এক পুরোনো ফাইলের নিচেই চাপা পড়ে গেল।
এটি শুধু শফিকের গল্প নয়। আমাদের দেশের অনেক মেধাবী গবেষকের নিত্যদিনের বাস্তবতা এটি। যেকোনো দেশের মেরুদণ্ড হলো গবেষণা আর উদ্ভাবন। আজ যে দেশগুলো প্রযুক্তিতে, চিকিৎসায় বা অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা সবাই গবেষণার পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিনিয়োগ করেছে। আমাদের দেশে গবেষণার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা এই ইউজিসি। কিন্তু তাদের অনুদান দেওয়ার বর্তমান যে প্রক্রিয়া, তা অনেক ক্ষেত্রেই সেকেলে, দীর্ঘমেয়াদি এবং অস্বচ্ছ।
আমরা যদি সত্যিই ‘ভবিষ্যতের জন্য অর্থায়ন’ বা ফিউচার ফান্ডিংয়ের কথা ভাবি, তবে ইউজিসির এই অনুদান বণ্টন প্রক্রিয়ায় এখনই বড়সড় বদল আনা দরকার। নীতিনির্ধারক ও ইউজিসির কর্তাব্যক্তিদের প্রতি আমাদের কিছু স্কষ্ট ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব রয়েছে:
১. ‘চেহারা’ নয়, ‘মেধা’র মূল্যায়ন (ব্লাইন্ড রিভিউ সিস্টেম): গবেষণার প্রস্তাবনা বা প্রপোজাল কে জমা দিয়েছেন, তার নাম, পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় কীÑএসব দেখে ফান্ড দেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রস্তাবনা যাচাই করার জন্য ‘ব্লাইন্ড রিভিউ’ চালু করা জরুরি। অর্থাৎ, যিনি প্রস্তাবনাটি পড়বেন ও নম্বর দেবেন, তিনি জানবেন না এটি কার লেখা। এতে শফিকের মতো তরুণ ও সাধারণ ঘরের গবেষকরা শুধু নিজেদের মেধার জোরেই অনুদান পাবেন।
২. লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো ও ডিজিটাল প্রক্রিয়া: ফান্ডের জন্য আবেদন থেকে শুরু করে টাকা হাতে পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি প্রচণ্ড আমলাতান্ত্রিক। পদে পদে কাগজপত্রের পাহাড়। এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি সহজ, আধুনিক ও স্বচ্ছ ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে হওয়া উচিত। গবেষক অনলাইনে আবেদন করবেন এবং তার ফাইলটি কোন পর্যায়ে আছে, তা ঘরে বসেই দেখতে পারবেন।
৩. দেশের সমস্যার সমাধানমুখী গবেষণা: আমাদের দেশে যানজট, ডেঙ্গু, কৃষির ক্ষতি বা বন্যার মতো শত শত জ্বলন্ত সমস্যা আছে। অথচ অনেক সময় দেখা যায়, ফান্ড দেওয়া হচ্ছে এমন সব গবেষণায়, যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো স¤‹র্কই নেই। নীতিনির্ধারকদের উচিত জাতীয় সমস্যাগুলোর একটি তালিকা করা। যেসব গবেষণা সরাসরি দেশের মানুষের কাজে আসবে, সেগুলোকেই অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৪. পদোন্নতির হাতিয়ার নয়, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: আমাদের দেশে অনেকেই গবেষণা করেন শুধু চাকরিতে প্রমোশন পাওয়ার জন্য। অনুদানের টাকা নিয়ে যেনতেনভাবে একটি জার্নালে লেখা ছাপিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং সেই গবেষণার দিনশেষে ফলাফল কী দাঁড়ালÑতার কড়া নজরদারি থাকতে হবে। ভালো কাজের জন্য যেমন পুরস্কার বা পরবর্তী ফান্ডিংয়ের নিশ্চয়তা থাকতে হবে, তেমনি অনুদানের টাকার অপচয় হলে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণা হলো মাটিতে বীজ বোনার মতো। আজ যদি আমরা সঠিক বীজে পানি না দিই, তবে কাল বড় কোনো ফসল ঘরে তোলার আশা করাটাই বোকামি। আমাদের তরুণদের মেধার অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার। ইউজিসির অনুদান প্রক্রিয়াটি যদি শুধু ক্ষমতাবানদের পকেট ভারী করার বদলে সত্যিকারের উদ্ভাবনকে মূল্যায়ন করতে পারে, তবে শফিকের মতো হাজারো তরুণের হাত ধরেই বদলে যাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। নীতিনির্ধারকরা কি এই পরিবর্তনের বীজ রোপণ করতে প্রস্তুত?