নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন দপ্তরের তথ্য বলছে, গত বুধবার এক দিনেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছেন ৭৪১ পর্যটক। অন্যদিকে বহির্গমন হয়েছে ৮২৩ জনের। অর্থাৎ ওই দিন ইমিগ্রেশন দিয়ে মোট ১ হাজার ৫৬৪ যাত্রী চলাচল করেছেন। এতে স্পষ্ট, ভারত ভ্রমণে বাংলাদেশিদের আগ্রহ ফের বাড়ছে।
সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় বিদেশি পর্যটন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কেন্দ ীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী গজেন্দ সিং শেখাওয়াত জানান, গত পাঁচ বছরে ভারতে আসা পর্যটকদের তালিকায় শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, জার্মানি, ফ্রান্স ও সিঙ্গাপুরও রয়েছে সেই তালিকায়।
মন্ত্রী আরও জানান, ২০২০ ও ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটক আগমনের নিরিখে শীর্ষস্থানে ছিল বাংলাদেশ। তবে ২০২১, ২০২২ ও ২০২৪ এ যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা ভারতে পর্যটন ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে উঠে এসেছে।
কলকাতার নিউমার্কেটের এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ থেকে প্রায় সমানসংখ্যক পর্যটক ভারতে আসেন। তবে ট্যুরিজম খাতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্য থেকেই। কলকাতার নিউমার্কেট ও বড়বাজার এলাকায় ব্যবসা প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর। তাই আমরা আশা করি, ভারত ও বাংলাদেশ দ্রুত বসে ভিসাজনিত জটিলতা মেটাবে। কারণ এই সমস্যার কারণে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশি পর্যটকের আগমন শুধু ভ্রমণ বা কেনাকাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কলকাতা ও ভারতের অন্য বড় শহরগুলোয় মেডিকেল ট্যুরিজমেও, অর্থাৎ চিকিৎসা খাতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কলকাতার মুকুন্দপুরের বেসরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, কেরালা ও হায়দরাবাদের হাসপাতালগুলো বাংলাদেশি রোগী ও তাদের সহযাত্রীদের উপর নির্ভরশীল।
গ্লোবাল ট্যুরিজম সংস্থার কর্মকর্তা উপাসনা ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশি পর্যটকরা মূলত দুটি কারণে ভারতে আসেনÑভ্রমণ ও চিকিৎসা। রোগী ও তার পরিবার চিকিৎসার পাশাপাশি কেনাকাটা ও ঘোরাঘুরি করেন। এর মাধ্যমেই গড়ে ওঠে মেডিকেল ট্যুরিজম। এতে যেমন পর্যটন খাত লাভবান হয়, তেমন ভারত সরকারেরও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ভিসাজনিত জটিলতা কিছুটা কমে আসায় পর্যটকের সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। আমরা চাই, এ সহযোগিতা আরও মজবুত হোক এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হোক।
বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বড় রকমের টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। জরুরি চিকিৎসা ছাড়া বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ রাখে ভারত। এর প্রভাব পড়ে দেশটির পর্যটনশিল্প ও ব্যবসায়। তবে আস্তে আস্তে ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ফি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মেডিকেল ভিসার সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি গত ১০ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, ব্যাঙ্গালোর ও দিল্লির ব্যবসায়ীরা নতুন আশার আলো দেখছেন। ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার ও বাংলাদেশের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এটি আগে ছিল ৮২৪ টাকা। তবে ভারতে পর্যটন ভিসা সহজ হলে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ভারত সফরকারী বাংলাদেশির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে গেছে। অবকাশ ও চিকিৎসা পর্যটনের ক্ষেত্রে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিকল্প দেশগুলোতে ঝুঁকছেন বাংলাদেশিরা।
পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলাদেশি পর্যটকেরা বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ভারতীয় হাইকমিশন সীমিত পরিসরে মূলত চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতেই শুধু ভিসা দিচ্ছিল।
ভারতীয় ভিসা সংকটের কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে অবকাশ ও চিকিৎসা পর্যটনের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েছে।
এছাড়া চিকিৎসাসেবার জন্য থাইল্যান্ডেও বাংলাদেশিদের ভ্রমণ বাড়ছে, তবে জটিল ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানে বাংলাদেশি পর্যটকদের সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দেশটিতে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ বাড়ছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে খুব শিগগিরই সরাসরি বিমান যোগাযোগও আবার চালু হতে পারে। সম্প্রতি পাকিস্তানের জিন্নাহ এয়ার বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন পেয়েছে।
শ্রীলঙ্কায়ও বাংলাদেশি পর্যটকদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩৯ হাজার ৫৫৫ বাংলাদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১২১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে বাংলাদেশ এখন শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতের দ্বিতীয় দ্রুততম বর্ধনশীল বাজারে পরিণত হয়েছে।

Discussion about this post