Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 6:11 pm

​ভালো মানুষের অভাব, নৈতিকতার সংকট ও আমাদের করণীয়

​সৈয়দা আরজুমা আখতার: একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ’—এ কথা আমরা বারবার শুনি। কিন্তু সেই মানুষ যদি নৈতিকতা হারায়, সততা ভুলে যায়, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেই সম্পদ হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বোঝা। আজকের বাংলাদেশে ঠিক এই বাস্তবতাটাই চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভালো মানুষের অভাব এখন আর কোনো অতিশয়োক্তি নয়, এটা এক তিক্ত সত্য। আর ভালো মানুষ কম বলেই ভালো কাজের দেখা পাওয়া হয়ে উঠেছে দুরূহ। এমন একটি সমাজে আমরা বাস করছি যেখানে সৎ থাকাটাকে মানুষ দুর্বলতা মনে করে, যেখানে সত্য কথা বলাটাকে বোকামি ভাবা হয়, যেখানে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধকে পুরনো দিনের ফ্যাশন মনে করা হয়।

​একটু থেমে ভাবুন—কবে শেষবার আপনি কোনো দোকানে গিয়ে পুরোপুরি সৎ ব্যবহার পেয়েছেন? কবে শেষবার কেউ প্রতিশ্রুতি দিয়ে হুবহু সেটা রক্ষা করেছে? কবে শেষবার কোনো সরকারি অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে অনেকেই স্মৃতি হাতড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। কারণ বেইমানি, প্রতারণা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অতিরিক্ত কথা বলা—এসব এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের স্বাভাবিক চরিত্র। যে মিথ্যা বলতে পারে চাতুর্যের সঙ্গে, সে চালাক। যে ঠকাতে পারে সূক্ষ্মভাবে, সে বুদ্ধিমান। আর যে সৎ থেকে হেরে যায়, সে বোকা। এই উল্টো মূল্যবোধ আমাদের সমাজকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

​নীতি-নৈতিকতার এই ভয়াবহ অবক্ষয়ের পেছনে কারণ কী? সমাজবিজ্ঞানীরা এর গভীরে যাওয়ার প্রয়োজনও মনে করছেন না—এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি। তবে যারা ভাবছেন, তারা মোটামুটি একটি জায়গায় একমত—দেশের বেশিরভাগ মানুষ অর্থবিত্ত, সম্পদ ও প্রতিপত্তির পেছনে এতটাই অন্ধভাবে ছুটছেন যে পারিবারিক শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ধর্মীয় অনুশাসন—তিনটিই একসঙ্গে হারিয়ে গেছে। যখন টাকাই হয়ে ওঠে জীবনের একমাত্র মাপকাঠি, তখন সততা বিলাসিতা হয়ে যায়, নৈতিকতা হয়ে যায় বোঝা, আর চক্ষুলজ্জা—সেটা তো কবেই বিদায় নিয়েছে।

​এই পরিস্থিতির সবচেয়ে করুণ শিকার আমাদের নতুন প্রজন্ম। তারা বড় হচ্ছে এমন একটি পরিবেশে যেখানে সততার কোনো পুরস্কার নেই, কিন্তু প্রতারণার আছে। তারা দেখছে—বাবা অফিসে মিথ্যা বলে প্রমোশন পাচ্ছেন, চাচা ঘুষ দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করছেন, পাড়ার বড় ভাই পরীক্ষায় নকল করে ফার্স্ট ক্লাস পাচ্ছে। এই শিশুরা যখন বড় হবে, তারা কোন মূল্যবোধ নিয়ে সমাজ গড়বে? তারা তো শিখেছে—জীবনে এগিয়ে যেতে হলে নীতির দরকার নেই, দরকার কৌশলের। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পচন ছড়াচ্ছে, আর আমরা নীরবে দেখে যাচ্ছি।

​কিন্তু ইসলাম এই নীরবতাকে মেনে নেয় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো, আর আল্লাহর ওপর ঈমান রাখো; এটাই তোমাদের জন্য উত্তম (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)। লক্ষ করুন—আল্লাহ শুধু নিজেকে ভালো থাকতে বলেননি। বলেছেন ভালোর আদেশ দিতে এবং মন্দকে প্রতিরোধ করতে। অর্থাৎ নৈতিকতা ইসলামে ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটা সামষ্টিক দায়িত্ব। যখন একটি সমাজ এই দায়িত্ব পালন করা বন্ধ করে দেয়, তখনই সেই সমাজে পচন ধরে, ঠিক যেমনটি আমরা আজ দেখছি।

​রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিসে বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে; তা না পারলে মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে); তাও না পারলে অন্তরে (ঘৃণা করে)—আর এটি ঈমানের দুর্বলতম স্তর (সহিহ মুসলিম)। আজকের বাংলাদেশে আমরা কোন স্তরে আছি? অধিকাংশ মানুষ তৃতীয় স্তরেও নেই। অন্যায় দেখেও অন্তরে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। বরং অনেকে অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করে গ্রহণ করে নিয়েছেন। এটা ঈমানের দুর্বলতম স্তরেরও নিচে—এটা ঈমানের অনুপস্থিতি।

​ইমাম গাযালী (রহ.) তাঁর ইহইয়া উলুমিদ্দীনে একটি অসাধারণ কথা লিখেছিলেন—চরিত্রের পতন হলো আত্মার রোগ, এবং এই রোগ শরীরের রোগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর, কারণ শরীরের রোগ দুনিয়ার জীবন কেড়ে নেয়, কিন্তু আত্মার রোগ দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই ধ্বংস করে। আমাদের সমাজ আজ এই আত্মার রোগে আক্রান্ত। এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—রোগী নিজেই জানে না যে সে অসুস্থ। যে ব্যক্তি প্রতিদিন মিথ্যা বলে অভ্যস্ত, সে মিথ্যা বলাটাকে আর মিথ্যা মনে করে না। যে ব্যক্তি নিয়মিত প্রতারণা করে, সে প্রতারণাকে ব্যবসায়িক কৌশল বলে চালিয়ে দেয়। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই সমাজের সবচেয়ে গভীর ক্ষত।

​পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষের এই প্রবঞ্চনার কথা বলেছেন, মানুষের মধ্যে এমনও আছে যে বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করি, অথচ তারা বিশ্বাসী নয়; তারা আল্লাহকে এবং মুমিনদের ধোঁকা দিতে চায়, আসলে তারা নিজেদেরই ধোঁকা দেয়, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না (সূরা আল-বাকারা, ২:৮-১২)। চৌদ্দশত বছর আগে নাযিল হওয়া এই আয়াতগুলো আজকের বাংলাদেশের সমাজচিত্রের যেন হুবহু প্রতিচ্ছবি। আমরা মুখে ঈমানের কথা বলি, নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, হজ করি—কিন্তু ব্যবসায় ভেজাল দিই, চাকরিতে দুর্নীতি করি, প্রতিবেশীর হক মারি, শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখি। এটা কি ঈমান? রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন—যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়, সে মুমিন নয় (সহিহ বুখারি)।

​তাহলে উত্তরণের পথ কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের বেশি দূর যেতে হবে না। ইসলাম শুধু একটি ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিগত নৈতিকতা থেকে শুরু করে সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সুবিচার এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসন—সবকিছুর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আছে। প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো পরিবার থেকে শুরু করা। আল্লাহ বলেছেন—হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬)। নিজেকে আগে ঠিক করুন, তারপর পরিবারকে। সন্তানকে শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখবেন না—আগে ভালো মানুষ বানান। সততা শেখান, সত্য বলার সাহস দিন, অন্যের কষ্ট বোঝার হৃদয় তৈরি করুন।

​শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (রহ.) বলেছিলেন—সমাজ সংশোধনের শুরু হয় ব্যক্তি সংশোধন থেকে, আর ব্যক্তি সংশোধনের শুরু হয় হৃদয় সংশোধন থেকে। আমাদের হৃদয়ে যদি আল্লাহর ভয় থাকে, তাহলে জিহ্বায় মিথ্যা আসবে না। হৃদয়ে যদি পরকালের জবাবদিহিতার চিন্তা থাকে, তাহলে হাত অন্যের সম্পদে যাবে না। হৃদয়ে যদি মানবতাবোধ জাগ্রত থাকে, তাহলে চোখ অন্যের কষ্ট দেখে ফিরে যেতে পারবে না। সুতরাং সংশোধনের প্রথম ধাপ হলো হৃদয়কে জাগানো—আর হৃদয় জাগে কোরআনের সংস্পর্শে, আল্লাহর স্মরণে এবং মৃত্যু ও পরকালের চিন্তায়।

​দ্বিতীয় করণীয় হলো—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতাকে কেন্দ্রে আনা। বর্তমানে আমরা সন্তানদের পড়াচ্ছি কীভাবে বেশি নম্বর পেতে হয়, কিন্তু শেখাচ্ছি না কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়। ইমাম মালিক (রহ.) বলেছিলেন—আমি আদব শিখেছি ইলম শেখার আগে। অর্থাৎ জ্ঞানের আগে আচরণ, তথ্যের আগে চরিত্র। আমাদের স্কুলগুলোতে যদি গণিত ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি সততা, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পাঠ থাকত—তাহলে আজকের চিত্র অন্যরকম হতে পারত। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছিলেন—তোমরা তোমাদের সন্তানদের আদব শেখাও, কারণ তারা তোমাদের যুগের জন্য সৃষ্টি হয়নি, তারা সৃষ্টি হয়েছে তাদের নিজেদের যুগের জন্য।

​তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভালো কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কার। আমাদের সমাজে ভালো মানুষ যে একেবারে নেই তা নয়। আছেন। কিন্তু তারা নীরব, অদৃশ্য, অবহেলিত। যে শিক্ষক বিনা বেতনে গরিব ছাত্রদের পড়ান, তাকে কেউ চেনে না। যে ব্যবসায়ী সতভাবে ব্যবসা করেন, তিনি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। যে সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ নেন না, তাকে সহকর্মীরা উপহাস করেন। এই পরিবেশে ভালো মানুষেরা হতাশ হন, আর অনেকে একসময় স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন। আমাদের দায়িত্ব হলো, এই ভালো মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহস জোগানো, তাদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না (আবু দাউদ)।

​সমকালীন ইসলামী চিন্তাবিদ ড. তারিক রামাদান তাঁর লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন—আধুনিক মুসলমানের সংকট হলো তারা ইসলামকে শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে; কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা হলো সামাজিক ন্যায়বিচার, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং প্রতিটি কাজে জবাবদিহিতার চেতনা। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, কিন্তু নামাজ থেকে বের হয়ে যদি দোকানে ভেজাল দিই—তাহলে সেই নামাজ কী কাজে এলো? আমরা রমজানে রোজা রাখি, কিন্তু রোজা রেখে যদি কারও গিবত করি, কাউকে ঠকাই—তাহলে সেই রোজার মূল্য কতটুকু? আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন—নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪৫)। আমাদের নামাজ যদি আমাদের মন্দ থেকে বিরত না রাখে, তাহলে বুঝতে হবে—নামাজে ত্রুটি নেই, ত্রুটি আমাদের নিয়তে, আমাদের আন্তরিকতায়।

​সবশেষে একটি কথা বলতে চাই—হতাশ হবেন না। অন্ধকার যতই গাঢ় হোক, ভোর আসে। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষী—জাহেলিয়াতের সবচেয়ে ঘোর অন্ধকারে এসেছিল ইসলামের আলো। মক্কার সেই সমাজ যেখানে জীবন্ত কন্যা সন্তানকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো, যেখানে মদ ও জুয়া ছিল জীবনের অঙ্গ, যেখানে শক্তিশালী দুর্বলকে শোষণ করত নির্দ্বিচারে—সেই সমাজকেই রাসূলুল্লাহ (সা.) মাত্র তেইশ বছরে পৃথিবীর সবচেয়ে নৈতিক ও ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতায় রূপান্তরিত করেছিলেন। তিনি কীভাবে করেছিলেন? সেনাবাহিনী দিয়ে নয়, অর্থ দিয়ে নয়—চরিত্র দিয়ে। আল্লাহ নিজে তাঁর সার্টিফিকেট দিয়েছেন—নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত (সূরা আল-কালাম, ৬৮:৪)। আজকেও পরিবর্তন আসবে সেই পথেই—চরিত্রের পথে, নৈতিকতার পথে, আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাসের পথে।

​সুতরাং পরিবর্তনের শুরু আপনি থেকে, আমি থেকে। আজ থেকে সিদ্ধান্ত নিন—আমি সত্য বলব, যদি তাতে ক্ষতি হয় তবুও। আমি সৎ থাকব, যদি তাতে হেরে যাই তবুও। আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, যদি একা হয়ে যাই তবুও। কারণ আল্লাহ বলেছেন—যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ় রাখবেন (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:৭)। এই একটি আয়াতই যথেষ্ট সাহস জোগানোর জন্য। আল্লাহর পক্ষে দাঁড়ান, আল্লাহ আপনার পক্ষে দাঁড়াবেন। নৈতিকতার এই সংকট চিরস্থায়ী নয়। যেদিন আমরা প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে ভালো মানুষ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেব, সেদিন থেকেই পরিবর্তন শুরু হবে। কারণ একটি মোমবাতিই যথেষ্ট একটি ঘরের অন্ধকার দূর করতে। আপনি সেই মোমবাতি হোন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন।