Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 5:10 am

ভূমিকম্প আতঙ্কে স্থবির শিক্ষাঙ্গন

রোদেলা রহমান : সাম্প্রতিক কয়েক দফা ভূমিকম্প ও আফটারশকের পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম আংশিক বা পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে। মূল ভবনে ঝুঁকির আশঙ্কা, আবাসিক হলের ফাটল এবং ভবনগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রশাসন জরুরি বৈঠকে ক্যাম্পাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে হঠাৎ পাঠদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ-বই থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং একাডেমিক মনোযোগ হারানোর ভয়।

গত ২১ নভেম্বর দেশে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা ঢাকাসহ আশপাশের এলাকাকে কাঁপিয়ে দেয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীর নিকটবর্তী এলাকা। এর প্রভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরের ২৪ থেকে ৩২ ঘণ্টায় একাধিক আফটারশক অনুভূত হয়, ফলে রাজধানীর পুরোনো ভবন ও আবাসিক হলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যায়।

ভূমিকম্পের রেশে রাজধানীর কিছু স্কুল, কলেজসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বা পরীক্ষাও স্থগিত হয়েছে। যদিও পুরো দেশব্যাপী স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করার মতো কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত আসেনি, তবুও ঝুঁকি ও আতঙ্ককে আঁকড়ে ধরে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে ক্লাস বন্ধ বা পরীক্ষা স্থগিত করেছে। ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ভীষণ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বলছে, ভূমিকম্পের পরে বাড়িতে ফিরে এসে তারা পড়ার মন পাচ্ছেন না; শিশুকিশোরেরা রাতেও ভীতি অনুভব করছে।

এ বিষয়ে এক অভিভাবক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘স্কুল বন্ধ হয়নি বলে ছেলেকে পাঠাতে হলো, কিন্তু ভয় ভয়াভীতি থেকে গেছে। এখনো বুঝতে পারছে না, ভূমিকম্প হলে কী করবে। শিশুপাঠের এমন বিভ্রান্তি পড়াশোনায় ক্ষতি করছে।’

এ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) জরুরি সিদ্ধান্ত হিসেবে ২২ নভেম্বর রাতে ঘোষণা দেয়, আগামী ১৫ দিন সব একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা ২৩ নভেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে আবাসিক হল খালি করে বের হয়ে আসবে।

পরিস্থিতি সামলাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও গত ২৩ নভেম্বর থেকে চার দিনের জন্য শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষা বন্ধ রাখে। কিন্তু ৩০ নভেম্বর থেকে তারা অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) ঝুঁকি ও আতঙ্কের কারণে ২৩ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

পরিস্থিতি এমন হয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী এখন পড়াশোনায় মনোযোগ রাখতে পারছে না। আবাসিক হলে থাকা, বই পড়া, পরীক্ষা পরিকল্পনা-সবকিছুই অনিশ্চয়তায় ভর করছে। বিশেষ করে যারা রুটিন কুইজ ল্যাব গ্রুপ ক্লাসের ওপর নির্ভর করতেন, তারা এখন পড়ার গতি হারিয়ে ফেলেছেন।

এই অস্বস্তিকর অবস্থায় শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসের দাবি তুলেছেন। শিক্ষার্থীদের যুক্তি করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাস চালিয়েছে, পাঠদান চলমান রেখেছে; এখনও অনুরূপ ব্যবস্থা চালু হলে একাডেমিক ক্ষতি রোধ করা যাবে।

এত সহসা ক্লাস বন্ধ ও ভবনের ভেতরের বিপজ্জনক পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় গুরুতর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ বিরতি এবং সিলেবাস অমীমাংসিত-এসব মিলিয়ে পড়াশোনা থমকে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা সেমিস্টার শেষ বা থিসিস/পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক অভিভাবক বলছেন, শিশুরা রাতেও ভয় পাচ্ছে, ঘুম কম পড়ছে, পড়াশোনায় মন বসছে না।

এ বিষয়ে ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস বিভাগের এক শিক্ষার্থী আজয় দেব শেয়ার বিজকে বলেন, ‘হোস্টেলে থাকতে ভয়, বই খুলেও মন বসে না। পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট কী হবে, কেউ জানে না। এ অবস্থা কখন শেষ হবে, কেউ বলতে পারছে না।’

অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রী উভয়েই বলছেন, নিরাপত্তা প্রয়োজন, কিন্তু পড়াশোনা থামিয়ে রাখা যায় না। অনলাইন ক্লাস, হাইব্রিড পন্থাই এখন বাস্তব সমাধান।

শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, যদি সরাসরি ক্লাস বন্ধ রাখতেই হয়, তাহলে করোনাকালের মতো অনলাইন ক্লাস চালু করা হোক, যাতে একাডেমিক ক্ষতি রোধ করা যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী পার্থ প্রতিম দে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শারীরিক ক্লাস সম্ভব নয়, কিন্তু অনলাইন ক্লাস চালু করলে পড়াশোনা থেমে থাকবে না।’

শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাঠামোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নজর দেয়া এখন সময়ের দাবি, কারণ ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক ঝুঁকি, দুর্যোগ বা অন্য যেকোনো কারণে যদি সশরীর ক্লাস বন্ধ থাকে, তবুও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চালু রাখতে হবে। তবে একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এমন অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ শিশু ও শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক এবং একাডেমিক স্বাস্থ্যকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যÑদুটোর ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য একটি সামগ্রিক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অবকাঠামোগত ঝুঁকির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতেই পারে, কিন্তু তাই বলে একবিংশ শতাব্দীতে এসে পড়াশোনা থামিয়ে রাখা যাবে না। করোনার সময় আমরা প্রমাণ করেছি, প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং সেশন জট এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত দ্রুত হাইব্রিড বা অনলাইন পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সশরীরে ক্লাসের ঝুঁকি না নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করাই এখন সময়ের দাবি।’

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য দুটোর ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য একটি সামগ্রিক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এখন সময় সবচেয়ে বাস্তবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভবন মূল্যায়ন, মেরামত, নিরাপত্তা আর একই সঙ্গে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।