শেয়ার বিজ ডেস্ক : বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় গত ১৯ জানুয়ারি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমির সুরক্ষার উদ্দেশ্য শিরোনামে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অধ্যাদেশ নাম্বার ১২,২০২৬। অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছে, তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সমালোচকরা বলছেন, ভূমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করা ঠিক হয়নি। কেউ কেউ বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্যে একটি গ্রুপ ছিল যারা জনস্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ফায়দা লুটেছেন।
অনেকেই বলছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তারা সেটি না করে নিজেদের স্বার্থে অপ্রাসঙ্গিক সাবজেক্ট নিয়ে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করেছেন। এতে রাষ্ট্র ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অধ্যাদেশের কারণে সমাজে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হতে পারে।
কৃষিভূমির মূল ধারণা হলোÑএমন জমি যা প্রধানত ফসল উৎপাদন, উদ্যানতত্ত্ব, পশুপালন বা মৎস্য চাষের মতো সরাসরি উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহƒত হয়। কিন্তু প্রকাশিত গেজেটে এ সংজ্ঞাকে এতটাই বিস্তৃত করা হয়েছে যে, এতে এমন অনেক ভূমি ও অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যা বাস্তবে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়।
অধ্যাদেশটির সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে এর আওতাভুক্ত ভূমির তালিকায়। এখানে নাল বা বিলান জমির পাশাপাশি ভিটা, ভিটি, ডাঙ্গা, এমনকি বাড়ির পাশের পরিত্যক্ত জমি বা আবর্জনার ভাগাড়কেও কৃষিভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাস্তবে কৃষকের থাকার ঘর বা বসতভিটা (ভিটি) কখনোই সরাসরি ফসল উৎপাদনের জমি নয়।
বাস্তবে কৃষকের থাকার ঘর (ভিটি) বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের পুকুর সরাসরি ফসল উৎপাদনের জমি নয়; বরং এগুলো তার অস্তিত্ব ও আশ্রয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভূমিগুলোকে আইনিভাবে কৃষি জমির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে ভবিষ্যতে নিজের ভিটায় ঘর তোলা, সংস্কার বা প্রয়োজনে ব্যবহারের ধরন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কৃষককে চরম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হবে।
‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ কৃষিভূমির ত্রুটিপূর্ণ ও অস্পষ্ট সংজ্ঞা মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির এক বিশাল চারণভূমি তৈরি করতে পারে। যখন কৃষকের বসতভিটা, পুকুর বা নার্সারির মতো ব্যক্তিগত জমিকে ঢালাওভাবে ‘কৃষি জমি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সেই জমির ব্যবহার বা সামান্য সংস্কারের জন্যও সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক অনুমতির গোলকধাঁধায় পড়তে হবে।
অধ্যাদেশে নদীর চরের জমি, বাঁধ বা রাস্তার ঢালকেও কৃষিভূমির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ এসব ভূমি প্রাকৃতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং এগুলো পরিবেশগত সুরক্ষার (যেমন: বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা জীববৈচিত্র্য রক্ষা) জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোকে ঢালাওভাবে কৃষিভূমি বলায় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নীতিতে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত উর্বর কৃষিজমি রক্ষা পাবে না, অন্যদিকে অনুৎপাদনশীল জমি নিয়ে আইনি জটিলতা বাড়বে।
যদি প্রায় সব ধরনের খোলা বা অনির্দিষ্ট জমিকে কৃষিভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে পরিকল্পিত শহর সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন বা সরকারি বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অযৌক্তিক বাধার মুখে পড়বে। অন্যদিকে, নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রায় সব ধরনের খোলা জমিকে কৃষিভূমি হিসেবে চিহ্নিত করলে শহরের পরিকল্পিত সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অযৌক্তিক বাধার মুখে পড়বে।
গেজেটে এক-ফসলি, দুই-ফসলি বা তিন-ফসলি শ্রেণিবিন্যাসকে কৃষিভূমির ‘মৌলিক সংজ্ঞার’ অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে এটি সঠিক নয়। ফসলের সংখ্যা হলো জমির উৎপাদনশীলতা বা ব্যবহারের একটি বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি মাত্র, এটি ভূমির মৌলিক সংজ্ঞা হতে পারে না। ভূমির স্থায়ী বৈশিষ্ট্য আর সাময়িক ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যকে এক করে দেখা একটি পদ্ধতিগত ভুল।
আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় কৃষিভূমি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাটির উর্বরতা, টপোগ্রাফি (ভূমির উচ্চতা), জলবায়ু, সেচ সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতাকে (ল্যান্ড ক্যাপাবিলিটি) গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই গেজেটে মাটির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বা সক্ষমতাকে তোয়াক্কা না করে কেবল ঐতিহ্যগত বা স্থানীয় কিছু নাম ব্যবহার করে ভূমি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংজ্ঞাটিতে ‘উদ্যান ফসলি’ (ফল, ফুল, সবজি) এবং ‘মাঠ ফসলি’ (ধান, গম, ভুট্টা) জমিকে একই কাতারে রাখা হয়েছে। বাস্তবে এই দুটি কৃষি ব্যবস্থাপনার ভিন্ন ভিন্ন শাখা। এই দুই ধরনের জমিকে একইভাবে সংজ্ঞায়িত করলে কৃষি পরিসংখ্যান এবং উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেবে।
