নিজস্ব প্রতিবেদক : ভেনামি চিংড়ির পোনা আমদানিতে নতুন ও বিদ্যমান সব ধরনের অনুমোদন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি চাষের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত ৭ জানুয়ারি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
এদিকে, সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারত থেকে প্রায় ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির ‘নপলি’ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের চিংড়ি হ্যাচারির মালিকরা। তাদের দাবি, আইন ও সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে মৎস্য অধিদপ্তর এ অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশে চিংড়ি পোনা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৫০টি হ্যাচারি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এরপর গত বুধবার সে অনুমতি বাতিল করা হয়। এরপর ভেনামি চিংড়ি আমদানির বিষয়টি সামনে এসেছে।
এদিকে ৭ জানুয়ারি ওই সভার উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ভেনামি চিংড়ি একটি আমদানিনির্ভর প্রজাতি। এর পোনা আমদানির মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ, পরিবেশ দূষণ এবং দেশীয় বাগদা ও গলদা চিংড়িসহ স্থানীয় প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভেনামি চিংড়ি চাষের অবাধ সম্প্রসারণ সমীচীন নয় বলে সভায় অভিমত ব্যক্ত করা হয়।
আলোচনায় ভেনামি চিংড়ি চাষকে নিয়ন্ত্রিত, নিবিড় ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ইতোমধ্যে অনুমোদনপ্রাপ্ত ভেনামি চাষিদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি এবং চাষের শর্তসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন হচ্ছে কি না, তা সরেজমিন মূল্যায়নের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ওই মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভেনামি চিংড়ি চাষে পোনা আমদানির সব প্রকার নতুন ও বিদ্যমান অনুমোদন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয় ওই সভায়।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, ভেনামি চিংড়ি চাষের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিরূপণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা এবং গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় বাগদা ও গলদা চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশীয় চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণে উপযুক্ত প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট জেলার মৎস্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগের দিন অর্থাৎ বুধবার দেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারত থেকে প্রায় ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির ‘নপলি’ আমদানির অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশের চিংড়ি হ্যাচারির মালিকরা। তাদের দাবি, এই নপলি আমদানি হলে দেশে চিংড়ি পোনা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৫০টি হ্যাচারি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন হ্যাচারির মালিকরা।
শহরের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে ‘শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব)’ নামের একটি সংগঠন ওই সংবাদ সম্মেলন করে। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনটির সভাপতি ও কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান।
নপলি চিংড়ির জীবনের একেবারে প্রথম ধাপ। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর চিংড়ির প্রাথমিক দশাকে নপলি বলে। এগুলো দেখতে অনেকটা মাকড়সার মতো। নপলি থেকে পোনা হতে সময় লাগে ১৮ থেকে ২১ দিন। এরপরই পোনা চাষের জন্য বাজারজাত করা হয়। লুৎফুর রহমান বলেন, গত ৩ ডিসেম্বর মৎস্য অধিদপ্তর সাতক্ষীরার দেবহাটার পুরুলিয়া বাজারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারত থেকে ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির নপলি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। অনুমতি পাওয়ার পর কলকাতার ‘বিধা ফিশ ট্রেডার্স’ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে নপলি আমদানির প্রস্তুতি চলছে।
লুৎফুর রহমান বলেন, ‘অনুমোদন পাওয়া এ নপলি দেশে এলে পরবর্তী সময় আরও বেশি আসবে। এটি আর নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় থাকবে না। ভেনামি নপলি আমদানি বন্ধের দাবিতে ইতোমধ্যে তারা মৎস্য উপদেষ্টা ও মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।’
সংগঠনটির মহাসচিব গিয়াস উদ্দিন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের এই অনুমতি সরাসরি ২০২৩ সালে প্রণীত ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন নীতিমালা এবং ‘মৎস্য সঙ্গনিরোধ বিধিমালা-২০২৪’-এর লঙ্ঘন। বিদ্যমান বিধিমালায় ভেনামি চিংড়ির নপলি আমদানির কোনো আইনি সুযোগ নেই।
গিয়াস উদ্দিন বলেন, বর্তমানে দেশে ভেনামি চিংড়ির পিএল উৎপাদনের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত ছয়টি হ্যাচারি রয়েছে। এসব হ্যাচারি কক্সবাজার, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলক ভেনামি চাষে পোনা সরবরাহ করছে। ফলে আলাদাভাবে নপলি আমদানির কোনো যৌক্তিকতা নেই।
দেশেই পর্যাপ্ত ভেনামি উৎপাদন হচ্ছে উল্লেখ করে গিয়াস উদ্দিন বলেন, বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি অনুযায়ী ভেনামি চাষে সর্বোচ্চ পোনার প্রয়োজন পড়ে ১৫ থেকে ২০ কোটি। অথচ অনুমোদিত ৬টি হ্যাচারির উৎপাদনক্ষমতা ২০০ থেকে ২৫০ কোটি পোনা। এ অবস্থায় ভারত থেকে ৪২ কোটি নপলি আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। এর পরের দিন সব ধরনের ভেনামি আমদানির অনুমোদন স্থগিত করে সরকার।
