শেয়ার বিজ ডেস্ক : ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শনিবার নিজের সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানান, তাদের আটক করে ভেনেজুয়েলার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যুক্তারষ্ট্রের আদালতে তাদের বিচার হবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে, এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ইরানসহ বিভিন্ন দেশ।
ট্রুথ সোশ্যালে করা পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সাফল্যজনকভাবে একটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে আর দেশটির নেতা, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে, যিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন, আটক করে আকাশপথে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই অভিযান চালানো হয়েছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলন করার কথা।
রয়টার্স লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে পানামায় আক্রমণ করার পর থেকে লাতিন আমেরিকায় এ ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ আর করেনি। ৩৬ বছর আগের ওই ঘটনায় মার্কিন বাহিনী পানামায় অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে পদচ্যুত করে ও তারপর আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়েছিল।
ট্রাম্প মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের কথা জানালেও ভেনেজুয়েলা সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি নিশ্চিত করেনি।
মাদুরো একটি ‘মাদক-রাষ্ট্র’ পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি নির্বাচনে কারচুপি করেছেন বলেও অভিযোগ ওয়াশিংটনের।
অপরদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো পাল্টা অভিযোগ করে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন তার দেশের জ্বালানি তেলের মজুতের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেলের মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো চাভেসের পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন মাদুরো। মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করেছে।
এর আগে গতকাল ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সিএনএনের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের প্রভাবে শহরের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে এবং বড় একটি অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
এদিকে এ ঘটনায় রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ নিন্দা জানিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ‘সশস্ত্র আগ্রাসনের’ ঘটনায় মস্কো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তারা এ ঘটনার নিন্দা জানায়। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়টি বলেছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও উত্তেজনা বৃদ্ধি ঠেকানো এবং সংলাপের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার ওপর মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘বাইরে থেকে কোনো ধ্বংসাত্মক, সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া ভেনেজুয়েলার
জনগণকে তাদের নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’ এতে আরও বলা হয়, ‘আমরা ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি সংহতি এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির নেতৃত্বের
নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।’
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেল বারমুদেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে কড়া ভাষায় ভেনেজুয়েলায় হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘অপরাধমূলক হামলা’ চালানোর জন্য ওয়াশিংটনকে অভিযুক্ত করে জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে দিয়াজ ক্যানেল বলেন, কিউবার তথাকথিত ‘শান্তি অঞ্চলের’ ওপর ‘বর্বর হামলা’ চালানো হচ্ছে। মার্কিন এই পদক্ষেপকে তিনি শুধু ভেনেজুয়েলার জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং আরও বিস্তৃতভাবে ‘আওয়ার আমেরিকার’ বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেছেন।
‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু, আমরা করব জয়’Ñএই বিপ্লবী সেøাগানটি দিয়ে তিনি বিবৃতিটি শেষ করেন।
সারাবিশ্বে কিউবার বিভিন্ন দূতাবাস থেকে প্রচারিত ওই বিবৃতিতে হাভানা বলেছে, দেশটি ‘ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার নিন্দা জানাচ্ছে।’ এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা ‘ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা এবং দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা চরমভাবে লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো লিখেছেন, ‘পুরো বিশ্বকে সতর্ক করছি, তারা (যুক্তরাষ্ট্র) ভেনেজুয়েলায় হামলা করেছে।’
পেত্রো আরও বলেন, ‘কলম্বিয়া প্রজাতন্ত্র তার এই বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করছেÑঅবশ্যই যে কোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের ওপর শান্তি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবন ও মানবমর্যাদার সুরক্ষা প্রাধান্য পাবে।’
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলছে, মাদ্রিদ ভেনেজুয়েলায় উত্তেজনা প্রশমন, সংযম এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি ভেনেজুয়েলায় একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার প্রস্তাবও দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদুরোর বিচার করা হবে: যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর মাইক লি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, যেহেতু মাদুরোকে আটক করা হয়েছে তাই ভেনেজুয়েলায় আর কোনো হামলা চালানো হবে না। অপরদিকে আটককৃত মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এখানেই হবে তার বিচার।
মাইক লি মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে লিখেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ধারণা দিয়েছেন, মাদুরো যেহেতু এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, তাই ভেনেজুয়েলায় আর হামলা চালানো হবে না। মাদুরোকে আটকের ওয়ারেন্ট যারা বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিলেন তাদের রক্ষায় ভেনেজুয়েলায় মধ্যরাতে এসব হামলা চালানো হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ মাদুরো ভেনেজুয়েলায় একটি মাদক সাম্রাজ্য চালান। সেখানে মাদক উৎপাদন করে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। এ কারণে মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সালেই পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তার বা আটকে সহায়তা করলে ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, মাদুরোকে আটক করেছে ডেল্টা ফোর্স। এটি দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post