আনোয়ার হোসাইন সোহেল : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের কোম্পানি বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেডের (বিডি ওয়েল্ডিং) মাত্র ২০ দিনে প্রায় ৫৮ শতাংশ দর বৃদ্ধির পর বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে চলতি জানুয়ারির ১ তারিখ পর্যন্ত লেনদেনে অংশ নেওয়া কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেডের শেয়ারদর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ৫৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে; যা তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে চলতি ১ জানুয়ারি থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি।
এর আগে ২০২৩ সালে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেড বিডি ওয়েল্ডিংয়ের ২৫ শতাংশ শেয়ার কেনার কথা থাকলেও কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত সেই শেয়ার কিনেনি। তবে কেন কোম্পানিটির শেয়ারদর বাড়ছে তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি বিএসইসি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সরকারি কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল বিডি ওয়েল্ডিং। ১৯৮৩ সালে আসে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে; ছিল একচেটিয়া বাজার। পণ্যের মানও ছিল বেশ ভালো। তারপরও ঋণের টাকা দিতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানিটি শেষে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২৩ সালে জানুয়ারিতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম বিডি ওয়েল্ডিংয়ের মালিকানা বদলের অনুমোদন দিয়েছিলেন। বিডি ওয়েল্ডিংয়ের মালিকানা বদলের অনুমোদন-সংক্রান্ত চিঠিতে বিএসইসি বলেছে, আইসিবির হাতে থাকা ১ কোটি ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯৯টি শেয়ার এখন কিনে নিতে পারবে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের দুই পরিচালক। কোম্পানিটির মোট ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩০৫টি শেয়ার আছে বাজারে। সেই হিসাবে সি পার্ল আইসিবির কাছ থেকে যে শেয়ার কিনছে তার পরিমাণ প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।
একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বিডি ওয়েল্ডিংয়ের উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম নুরুল ইসলাম মারা যান। বিডি ওয়েল্ডিংয়ে তার ২৫ লাখ শেয়ার ছিল বলে জানিয়েছেন তার ছেলে এসএম রাজিবুর ইসলাম।
বিডি ওয়েল্ডিং ক্রয় করেনি সি পার্ল: সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের কোম্পানি সচিব আজহারুল মামুন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পরিচালকরা আসলে সেভাবে কিনতে চায়নি। এটি একটি দুর্বল কোম্পানি। এটির তেমন কিছুই নেই। বিএসইসির রিকোয়েস্টে ২০২৩ সালে স্যারেরা শেয়ার কেনার আবেদন করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সি পার্ল বিডি ওয়েল্ডিংয়ের শেয়ার ক্রয় করেনি।’
১৯৬৯ সালে বিডি ওয়েল্ডিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয় সরকার। ১৯৯৯ সালে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়ে মূলধন তুলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি। তাদের মূল ব্যবসা ছিল ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড তৈরি করা। আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন তৈরি করা। ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস হচ্ছে ঝালাই করার জন্য ব্যবহƒত রড।
বিডি ওয়েল্ডিংয়ের কোনো ওয়েবসাইট নেই: তালিকাভুক্ত হওয়ার আইন অনুযায়ী প্রতিটি কোম্পানির ওয়েবসাইট থাকা বাধ্যতামূলক। তবে ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেওয়া কোম্পানিটির ইউআরএল লিংকে বিডি ওয়েল্ডিংয়ের কোনো তথ্য নেই। বিএসইসির আইন অনুযায়ী পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকার কথা থাকলেও বিডি ওয়েল্ডিংয়ের সচল কোনো ওয়েবসাইট নেই। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ১ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ বিতরণ তথ্য দেওয়ার পর আর কোনো তথ্য দেয়নি কোম্পানিটি।
প্রয়াত পরিচালকের কারাদণ্ড হয়েছিল: শেয়ার করসাজির মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন প্রয়াত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম নুরুল ইসলাম। ২০১৫ সালে শেয়ার কারসাজি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। রায়ে বিডি ওয়েল্ডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল ইসলাম ও দ্য উইকলি ইন্ডাস্ট্রি পত্রিকার সম্পাদক এনায়েত করিমের তিন বছরের জেল ও প্রত্যেককে ২০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত।
১৯৯৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানির শেয়ার বর্তমানে লেনদেন হচ্ছে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে। ২০১৭ সালে কোম্পানিটি ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। তবে লভ্যাংশ দেয়নি। ২০১৮ অর্থবছরে লোকসান হয় ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০১৯ অর্থবছরে লোকসান হয় ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। লভ্যাংশ দেওয়া হয় প্রতি ১০০ শেয়ারে একটি বোনাস শেয়ার।
পুঁজিবাজারে এ কোম্পানির ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩০৫টি শেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে ৩১ দশমিক শূন্য এক শতাংশ আছে পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ শেয়ার, বিদেশিদের হাতে রয়েছে দশমিক ৭২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৬৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ শেয়ার। পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৪৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
কোম্পানিটি শেয়ারদরের এমন উত্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নতুন মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘শেয়ার বাজারের প্রতিটি কোম্পানি বিএসইসির সার্ভিল্যান্সের আওতার রয়েছে। এখানে বাজার কারসাজির কোনো সুযোগ নেই।’ কোম্পানিটির ওয়েবসাইট কেন নেই সে বিষয়ে ডিএসইর কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হবে বলেও জানান বিএসইসির মুখপাত্র।
