চট্টগ্রাম ব্যুরো : আগামী ১০ দিনের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের নতুন চালান না এলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) উৎপাদন। এতে সারাদেশে বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে জটিলতার কারণে দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের জ্বালানি খাতে। সংশ্লি®¡ ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে; যার অর্ধেকের বেশি আসে সৌদি আরব থেকে। বর্তমানে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি মাদার ভেসেল আটকা পড়ে আছে। জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন হওয়ায় নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সেটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারছে না। ফলে ইআরএলে তেলের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সবচেয়ে কম মজুত আছে অকটেন ও পেট্রোলের। অকটেনের মজুত আছে মাত্র ৯ দিনের। পেট্রোলের মজুত আছে ১১ দিনের। ডিজেল ১৪ দিনের মজুত থাকলেও আমদানির ধারা স্বাভাবিক থাকায় শঙ্কা কম। পেট্রোল ও অকটেনের বড় অংশ দেশীয় শোধনাগারে উৎপাদিত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হলে সরবরাহে দ্রুত প্রভাব পড়ে। ইতোমধ্যে অনেক পাম্পে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং গ্রাহকরা চাহিদামতো অকটেন না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) একটি সুখবর দিয়েছে। আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগর হয়ে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, রাস তানুরা বন্দরে আটকে পড়া জাহাজটি থেকে তেল খালাস করে অন্য কোনো দেশের জাহাজের মাধ্যমে দেশে আনার চেষ্টা চলছে। সব ধরনের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত বিকলগু উপায়ে তেল আনা নিশ্চিত করা যায়।
বিপিসির হিসাবে, ফার্নেস অয়েল ২৯ দিন এবং জেট ফুয়েল ২৩ দিনের মজুত থাকায় বিমান চলাচল ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে আপাতত ঝুঁকি নেই। তবে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ থাকলে বিকলগু পথে তেল আনতে বাড়তি জাহাজ ভাড়া গুনতে হবে, যা সামগ্রিকভাবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। গত ২২ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫টি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হয়েছে। বর্তমানে দুটি জাহাজে খালাস চলছে এবং আরও দুটি জাহাজ পথে রয়েছে। তবে সবার নজর এখন ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের চালানের দিকে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত তেল নিয়ে ১৬টি ও অপরিশোধিত তেল নিয়ে দুটি জাহাজ ছেড়ে আসার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত আটটি জাহাজ এসেছে। পথে আছে আরও তিনটি। বাকি জাহাজগুলো কোনটি কখন আসবে, তা অনিশ্চিত। গত ৪ মার্চ সৌদি আরব ও ২০ মার্চ আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ আসার শিডিউল ছিল। জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। এগুলো কবে আসবে তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিকলগু উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও ইরাকের কথা বিবেচনায় আনে বিপিসি। তবে এসব দেশ থেকে তেল আনতে সময় ও খরচ দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ আসতে যেখানে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লাগে, সেখানে বিকলগু এসব উৎস থেকে আনতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ ভাড়া লাগতে পারে তিনগুণ। এই বাস্তবতায় এখনও এই অঞ্চলের দেশের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post