Print Date & Time : 24 April 2026 Friday 8:14 pm

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা: বাংলাদেশের জ্বালানি ও রফতানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা!

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব বড় না হলেও এই সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি আমদানি এবং রফতানি খাতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশের সাথে ইরানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে ছোট—প্রায় ১ কোটি ডলার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সামগ্রিক অস্থিরতা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, শিপিং খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ হয় এই অঞ্চল থেকে। পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও ক্রুড অয়েল আমদানির ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভরশীলতা অত্যন্ত বেশি।

বর্তমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

ইতোমধ্যে কিছু পণ্যবাহী তেল ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ বিশাল। ব্যবসায়ী মহলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ছয় মাসে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের পেট্রোলিয়াম ও এলএনজি আমদানি করা হয়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এই খাতে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ জানিয়েছেন, প্রতি মাসে জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, বর্তমানে জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।

মধ্যপ্রাচ্য শুধু জ্বালানি আমদানির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বাংলাদেশের রফতানি বাজারের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মূলত তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হোম টেক্সটাইল রফতানি করে। এসব পণ্যের বার্ষিক রফতানি মূল্য প্রায় ৯০ কোটি ডলার।

অন্যদিকে, একই অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার ব্যয় করে থাকে।

এই হিসাবে দেখা যায়, আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বেশি।

বর্তমান উত্তেজনার আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংকটের কারণে শিপিং খরচ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সুয়েজ খালও মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ইউরোপে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

যদি এই রুটে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, তাহলে রফতানি ব্যয় বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে শুধু সমুদ্রপথ নয়, আকাশপথেও পরিবহন ব্যবস্থা কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সংঘাতপূর্ণ এলাকার আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। এতে কার্গো পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশের রফতানি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ব্যাহত হতে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

তার মতে, ভূরাজনৈতিক সংকট কখনোই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলে তা শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং রফতানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর কর্মকর্তারা অবশ্য তুলনামূলক আশাবাদী। তাদের মতে, যুদ্ধ বা উত্তেজনা যদি স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়, তাহলে বাংলাদেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ জানান, বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিচের দিকে রয়েছে। যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান তালিকার শেষের দিকে।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব অন্য একটি কারণে অত্যন্ত বেশি। অনেক সময় ইউরোপগামী পণ্যবাহী জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথ ব্যবহার করে। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের রফতানি সরবরাহ শৃঙ্খলেও প্রভাব পড়তে পারে।

সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু এলাকায় ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলার ফলে কিছু এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র এবং তেল শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।