নিজস্ব প্রতিবেদক : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, যা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যেও। আর এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। চলতি মাসের প্রথম ৯ দিনে দেশে এসেছে ১৫২ কোটি ৬০ লাখ বা ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, চলতি মার্চের প্রথম ৯ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১০১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এ অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২ হাজার ৩৯৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স, বছর ব্যবধানে যা বেড়েছে ২২ দশমিক ৯০ শতাংশ।
তবে ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে প্রচুর অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতেই বাড়ছে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলমান থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। গত জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছে ইতিহাসে কোনো এক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ও চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।
গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা ছিল দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ও চলতি অর্থবছরের কোনো এক মাসে আসা সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। গত নভেম্বরে দেশে এসেছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।
২০২৫ সালের অক্টোবর ও সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছিল যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ও ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আর গত আগস্ট ও জুলাইয়ে যথাক্রমে দেশে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ও ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জনই গিয়েছেন সৌদি আরবে। দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান। যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে, বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ দুটিÑরেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি। বিশ্বব্যাপী সংকটের মধ্যেও রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোকে সচল রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা এক বছরে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ধীর হয়ে যেতে পারে বা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব এবং রিক্রুটিং এজেন্সিজ ঐক্য পরিষদের সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে সংঘাত চলতে থাকলে বর্তমান কর্মীরা কাজ হারাতে পারেন। এতে নতুন কর্মী যাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স কমবে।
অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক মন্দায় মধ্যপ্রাচ্যে কাজ হারানোর ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন অনেকে। প্রবাসীদের আয়-উপার্জনের ওপরও একটা প্রভাব পড়বে, যার প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সের ওপর। কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্সের যে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে, যুদ্ধের কারণে এতে বাধা পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ আট অর্থনীতিবিদ। গত শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তারা এসব সুপারিশ তুলে ধরেন। তারা বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হুন্ডি লেনদেনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তারা। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরামর্শও দেন তারা।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গত রোববার দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর সুফল শিগগিরই দৃশ্যমান হবে বলে আমরা আশা করছি।
প্রবাসীদের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সোমবার মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, গতকাল মঙ্গলবার থেকে আগামী ১৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু থাকবে। এতে তিন শিফটে মোট ২১ জন কর্মকর্তা ও ৪২ জন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি স্থাপন করা হয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ভবনে অবস্থিত প্রবাসী কল সেন্টারে।
এতে আরও বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় থাকবেন ওয়েজ আর্নারস কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া। আর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান-১ শাখার উপসচিব মো. হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডল।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত শ্রমকল্যাণ উইংগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। পাশাপাশি নির্ধারিত ছক অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দেবেন।
