হাসান শিরাজি: রাতুল যখন ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলো, ওর বাবা শফিক সাহেবের চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে ধীরে ধীরে এক আর্থিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। রাতুল এখন ও-লেভেল দিচ্ছে। মাসের শুরুতে বেতন পেয়ে শফিক সাহেব যখন হিসাব মেলাতে বসেন, দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে ঘরের বাতাস। বাড়িভাড়া আর বাজারের খরচের চেয়ে এখন ছেলের কোচিংয়ের ফি বেশি! ঢাকার বুকে শফিক সাহেবের মতো হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের আজ একই গল্প।
আজকের বাংলাদেশে কোচিং বা প্রাইভেট পড়া যেন শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য (এবং ভয়ংকর) এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে এসএসসি, এইচএসসি কিংবা ইংলিশ মিডিয়ামের ও-লেভেল, এ-লেভেলÑকোথায় নেই এই কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য? স্কুল-কলেজের ক্লাসরুমের চেয়ে এখন কোচিং সেন্টারের বেঞ্চগুলো বেশি জমজমাট। কিন্তু এই ব্যবস্থা কি আসলেই শিক্ষার্থীদের কিছু শেখাচ্ছে? নাকি শিক্ষার এই পরিবেশকে দূষিত করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§কে শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে?
সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো। একজন শিক্ষকের মূল দায়িত্ব ক্লাসে বসে শিক্ষার্থীদের পড়ানো, তাদের বোঝানো। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, অনেক শিক্ষকই ক্লাসে যা পড়ানোর কথা, তা ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যান। কারণটা খুব সহজÑক্লাসে সব যত্ন নিয়ে পড়িয়ে দিলে তার কাছে প্রাইভেট পড়তে কে আসবে? ক্লাসের পর ক্লাসে তারা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেন, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা তাদের কাছে কোচিং করতে বাধ্য হয়।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে স্কুল, এরপর দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে এক কোচিং থেকে আরেক কোচিংয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কী দাঁড়াচ্ছে, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? এই অসুস্থ দৌড় তাদের শৈশব, কৈশোর আর স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে গিলে খাচ্ছে।
এবার একটু হিসাবের খাতায় চোখ বুলানো যাক। কল্পনা করুন, একজন নামকরা শিক্ষকের দিনে পাঁচটি থেকে ছয়টি ব্যাচ থাকে। প্রতিটি ব্যাচে অন্তত ২০ শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসে। আর প্রতি ছাত্রের কাছ থেকে মাসিক ফি নেওয়া হচ্ছে তিন-চার হাজার টাকা। মাস শেষে এই অঙ্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা হিসাব করলেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বছর শেষে যখন ‘মক টেস্ট’ বা মডেল টেস্টের সময় আসে, তখন এই শিক্ষকদের রূপ যেন আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর যে ছাত্রদের তারা পড়ালেন, তাদের কাছ থেকেই মক টেস্টের নামে এককালীন আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা! একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিশাল অঙ্কের ফি দেওয়াটা কতটা অসম্ভব, তা কি এই মানুষগুলো একবারও ভাবেন না? এ কেমন মানসিকতা? এরা কি আসলেই আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, নাকি স্রেফ অর্থলোভী কোনো দানব?
এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কি আমরা এভাবেই এই অর্থপিশাচদের হাতে জিম্মি থাকতে দেব? কোচিংয়ের এই জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের তরুণ প্রজš§ কি এভাবেই মেধা ও মনন হারাবে? আর অভিভাবকরা কি সর্বস্বান্ত ও দেউলিয়া হতে থাকবেন এই ‘দানবদের’ পকেট ভারী করতে গিয়ে?
সময় এসেছে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। স্কুল-কলেজগুলোকে বাধ্য করতে হবে, যাতে ক্লাসরুমের পড়া ক্লাসরুমেই নিশ্চিত হয়। তা না হলে শিক্ষার এই লাগামহীন বাণিজ্য আমাদের পুরো সমাজকেই এমন এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো উপায় থাকবে না।

Print Date & Time : 20 May 2026 Wednesday 2:30 pm
মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও ‘কোচিং-দানব’
শিক্ষা ♦ প্রকাশ: