Print Date & Time : 16 May 2026 Saturday 1:52 am

‘ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনে বাধ্য করল পুলিশ’

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে কেএসআরএমের রড পেটে ঢুকে মারা যাওয়া সেই দারোয়ানকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি এই ঘটনা থানায় বসে ধামাচাপা দিতে ৮০ হাজার টাকার রেট উঠেছে বলেও অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি চট্টগ্রামে বেশ আলোচনার জš§ দিয়েছে।
ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার কোনো ব্যক্তির লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হচ্ছে ফৌজদারি মামলার তদন্ত ও বিচারের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। ফলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকলে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা কঠিন হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরের কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কে কেএসআরমের রডবাহী একটি ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা দেন একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আবদুল মান্নানকে (৬১)। গাড়িতে থাকা খোলা রড তার পেট ছেঁদ করে আঘাত করে পেছনের দোকানেও। পশু জবাইয়ের মত রক্তস্রোতে ভরে যায় রাস্তা। নিহত আব্দুল মান্নান নোয়াখালী সদর উপজেলার বাঁধের হাট এলাকার মোহাম্মদ খোরশেদের ছেলে।
নিহত আব্দুল মান্নানের বোনজামাই মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেলের সামনে অভিযোগ করে বলেন, আমরা ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ বাড়িতে নিয়ে যেতে চাচ্ছি না। সকাল থেকে পাঁচলাইশ থানার পুলিশদের বললাম, আমরা ময়নাতদন্ত করবোই। এরপর আমাদের লাশটা বুঝিয়ে দেন। সেকেন্ড অফিসারও দায়িত্ব নিয়ে বললেন, সমস্যা নাই আমি ময়নাতদন্ত করানোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। এই কথা বলেই তারা সময়ক্ষেপণ করতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত বেলা ২টায় আবারও আমরা দেনদরবার করি দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য, কারণ লাশটা ইতোমধ্যে পচে যাওয়ার উপক্রম। তখনও তিনি বলেছেন, সমস্যা নাই, আমি করে দিচ্ছি। শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের এসআই আমিনুল সাহেবের কাছে পাঠালেন। তবে এসআই আমিনুল আমাদের বলছেন, এটা ময়নাতদন্ত হবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন আজ সময় শেষ। এরপর তিনি বলেন, তাহলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশটা আপনাদের দিয়ে দেই। তখন আমি বললাম, ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ আমি নিব না।
বেলায়েত হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো উপায় না পেয়ে আবারও সেকেন্ড অফিসারকে কল দেই। তখন তিনি বলেন, কাগজে যদি আরটিএ লিখা থাকে তাহলে ময়নাতদন্ত ছাড়াও দাফন করা যাবে, মামলাও প্রক্রিয়াধীন থাকবে। আদালতের বিচারে ময়নাতদন্ত করলে যেই রেজাল্ট বা ক্ষতিপূরণ পাবেন, এখনও সেটাই পাবেন। আপনারা এখানে (থানায়) একটা দরখাস্ত দেন, সেখানে লেখা থাকবে আমি ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে যাচ্ছি। এখন আমরা তো নিরুপায়। লাশটা যেন না পচে এই কারণেই নিয়ে যেতে হচ্ছে।
কেএসআরএমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, পুলিশ হয়তো তাদের সঙ্গে (কেএসআরএম) সমঝোতা করে আমাদের এমন হয়রানি করছেন। তারা বুঝাতে চাচ্ছেন, ময়নাতদন্ত না করলে মামলাটি একটু হাল্কা হবে। আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। আমরা শঙ্কা করছি এভাবেই আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। আমি মামলার কাগজ চাচ্ছি। তবে সেটাও আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। তারা বলছেন, কাগজ লাগবে না। মামলার কাগজ ছাড়াই আপনারা লাশ নিয়ে যান। আমি তাদের বললাম, আমি মামলা করেছি, আমাকে আপনারা কাগজ দিবেন না? তারা সরাসরি বলছেন, না কাগজ দেওয়া যাবে না।
নিহত আব্দুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ রাসেল অভিযোগ করে বলেন, সকাল থেকেই থানার স্যার (পুলিশের এসআই) আমাদের বলছিলেন ময়নাতদন্ত হয়ে গেছে বা চলতেছে। পরে বিকালে গিয়ে দেখলাম, কোনো পোস্টমোর্টেমই হয়নি। এর মধ্যে থানায় পুলিশ স্যাররা আমাদের ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলেছেন। ১৩ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্সসহ খরচ বাবদ আপাতত দিয়েছেন। বাকিগুলো পরে দিবেন।
মামলা প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং এই মামলা ধামাচাপা দিতে কোনো ভূমিকা রাখা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মিজানুল ইসলাম বলেন, এই বিষয়টি আমরা দফারফা কেন করতে যাব? এখানে আমাদের সম্পৃক্ততা (ইনভলমেন্ট) থাকতে হবে তো। পুলিশের মাধ্যমে তাদের চাপ দেওয়া বা মামলা ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন পাঁচলাইশ থানার এসআই নুরুল আবসার। তিনি বলেন, ৯৮, ১০৫ ধারায় মামলা হয়েছে। হয়রানির বিষয়টি মিথ্যা। এখানে কিছু দালাল জুটেছে, তারাই হয়তো এদের (ভুক্তভোগীদের) মিসগাইড করছে।
৮০ হাজার টাকার বিষয়টি ধামাচাপার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, এই বিষয়ে আমি জানি না। ভুক্তভোগী পরিবার যখন তাদের অসহায়ত্বের কথা আমাকে জানালো তখন আমি অ্যাম্বুলেন্স সমিতিকে বলে শুধু ড্রাইভার ও গ্যাসবিলের টাকা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে দিয়েছিলাম।

পরে তিনি আবার ফোন করে বলেন, আব্দুল মান্নান যেই বিল্ডিংয়ের দারোয়ান ছিল, তারা তাকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার জন্য ২০ হাজার টাকা এবং দফনের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে।
একই কথা বলেন পাঁচলাইশ থানার এসআই আমিনুল ইসলামও। তিনি বলেন, আমি তাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। আমি তাদের বলিনি পোস্টমোর্টেম ছাড়া লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য। উল্টো আমিই বলেছি, ময়নাতদন্ত করার জন্য। তারাই আমাদের কাছে দরখাস্ত দিয়েছেন। আর টাকা পয়সার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি কারও কাছ থেকেই ৮০ পয়সাও নেইনি। থানায় বসে ক্ষতিপূরণের বিষয় সমাধান করা যায় না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঁচলাইশ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার কাজী মো. বিধান আবিদ বলেন, আপনি আমার কাছে যেহেতু ফোন করেছেন, আমার প্রতিকার একটাই, আমার কাছে কোনো অন্যায় হবে না। তাকে (ভুক্তভোগী পরিবার) নিয়ে আসেন, তার অভিযোগ শুনে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা আমি নিবো। ৮০ হাজার টাকায় মামলা রফাদফার বিষয়টি আমি জানি না। তবে আপনাকে যে অভিযোগ করেছেন, তাকে বলেনÑএকই অভিযোগ আমাকেও দেওয়ার জন্য।