Print Date & Time : 24 May 2026 Sunday 2:33 am

মসলার পাইকারি বাজার মন্দা দাম কমলেও নেই ক্রেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র ঈদুল আজহা ঘিরে দেশের পাইকারি মসলার বাজারে প্রতি বছর যে কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়, এবার তার ব্যতিক্রম চিত্র ফুটে উঠেছে। কোরবানির ঈদ সামনে থাকলেও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এবং পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারÑদুই প্রধান পাইকারি বাজারেই ক্রেতা উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চাপের মুখে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে এলাচ, জিরা, লবঙ্গ, দারুচিনি, গোলমরিচ, জায়ফল, কিশমিশ ও বাদামসহ প্রায় সব ধরনের মসলার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু আগের মতো দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ক্রেতারা এসে বড় পরিসরে কেনাকাটা করছেন না। ফলে বাজারে লেনদেন কমেছে।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে শেয়ার বিজের জেলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গরম মসলার দোকানগুলোয় পণ্যের অভাব নেই। তবে ক্রেতার চাপ কম থাকায় দোকানিরা বেশিরভাগ সময় অপেক্ষায় থাকছেন। আগে যেখানে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ট্রাকভর্তি মসলা কিনে নিয়ে যেতেন, এবার সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যাচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের মসলার দাম কমেছে। পাইকারি বাজারে এলাচ মানভেদে দাম কয়েকশ টাকা কমে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ টাকায় নেমেছে। লবঙ্গের দাম কেজিতে কমেছে প্রায় ৫০ টাকা। জিরা এখন ৫২৫-৫৩৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল প্রায় ৫৫০ টাকা।

দাম কমার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করছেন চাহিদার ঘাটতি। সাধারণত ঈদের আগে চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে, কিন্তু এবার উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী কম দামে পণ্য ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

সব মসলার দাম কমলেও গোলমরিচের বাজার কিছুটা ব্যতিক্রম। কালো গোলমরিচের দাম বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভিয়েতনাম থেকে আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের প্রভাব সরাসরি পড়ছে। অন্যদিকে সাদা গোলমরিচের দাম কমে প্রায় ১ হাজার ২২০ টাকায় নেমেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিরা, লবঙ্গ, এলাচ ও জায়ফল আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এই পরিসংখ্যান বাস্তব বাজার পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরে না।

তাদের দাবি, স্থলবন্দর ও সীমান্তপথে বিপুল পরিমাণ মসলা দেশে প্রবেশ করছে; যার বড় অংশই আনুষ্ঠানিক হিসেবে ধরা পড়ে না। ফলে কাগজে-কলমে আমদানি কমলেও বাজারে সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।

খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, অবৈধভাবে আসা মসলার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বৈধভাবে আমদানি করা জিরার খরচ যেখানে কেজিতে প্রায় ৫৩০ টাকা, সেখানে কিছু ব্যবসায়ী ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। এলাচের ক্ষেত্রেও একই চিত্রÑবৈধ আমদানিতে খরচ বেশি হলেও বাজারে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।

পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারেও পরিস্থিতি প্রায় একই। বাজারে পণ্য থাকলেও ক্রেতার ভিড় কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে ঈদে দুপুর পর্যন্ত বিশ্রামের সুযোগ মিলত না। এবার সেই ব্যস্ততা নেই।প্রথম পৃষ্ঠার পর

বর্তমানে ভারতীয় জিরা ৫১৫ টাকা, আফগান জিরা ৬৭০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং দারুচিনি ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এলাচের দাম মানভেদে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে রয়েছে; যা গত বছরের তুলনায় কম।

বাজার বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা একমত যে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াই এই মন্দার প্রধান কারণ। আগে যেখানে খুচরা ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে বড় পরিমাণে মসলা কিনতেন, এখন তারা প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প করে কিনছেন। এতে পাইকারি বাজারে বিক্রি কমে গেছে।

আমদানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, ডলার সংকট, এলসি জটিলতা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিÑসব মিলিয়ে আমদানি খরচ বেড়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি।

মসলার বাজারে ভেজাল নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জিরার সঙ্গে নিম্নমানের বীজ মেশানো এবং গুঁড়া মসলায় ভেজালের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে অনেক ভোক্তা এখন গোটা মসলা কিনে নিজে গুঁড়া করার দিকে ঝুঁকছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমদানি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কার্যকর নজরদারির অভাবে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ঈদের সময় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তাদের মতে, সঠিক মনিটরিং থাকলে দাম ও সরবরাহÑদুটোই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারÑদুই বাজারের ব্যবসায়ীরাই বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভ তো দূরের কথা, অনেকেই লোকসানে পড়ছেন। বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও বিক্রি না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদ সামনে রেখেও দেশের পাইকারি মসলার বাজারে এবার দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক মন্দা। সরবরাহ পর্যাপ্ত, দাম তুলনামূলক কমÑতবুও ক্রেতার অভাবে বাজার জমছে না।

ব্যবসায়ীদের মতে, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, অবৈধ আমদানি এবং ভোক্তা আচরণের পরিবর্তনÑএই তিনটি কারণই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনে আরও চাপের মুখে পড়তে পারে এই খাত।

বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী এনায়েত উল্লাহ বলেন, মসলার বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। এই সময় যে দাম থাকা উচিত, তার তুলনায় অনেক পণ্যের দাম বরং কম আছে। চোরাচালানের মাধ্যমে কিছু মসলা আসার কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরাও চাপের মধ্যে থাকেন, কিন্তু মসলার বাজারে বড় কোনো সংকট নেই।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিবছর ঈদের আগে মসলার বাজারে চাপ তৈরি হয়। এই সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দেন। যথাযথ মনিটরিং থাকলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আমদানি থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত নজরদারি না থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ব্যবসায়ীদের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুর রহমান বলেন, এবার বাজার পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার মসলার বাজার অনেকটাই কমে এসেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছিল, কিন্তু পরে তা আবার কমে গেছে। এখন প্রায় সব ধরনের মসলার দামই গত বছরের তুলনায় কম।

তিনি বলেন, দাম কম থাকা সত্ত্বেও বাজারে বেচাকেনা প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। ফলে দাম কম হলেও বেচাকেনা তুলনামূলক কম হচ্ছে।