রুশাইদ আহমেদ : ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক জরিপ মোতাবেক বিশ্বে বর্তমানে ১০০ কোটিরও অধিক মানুষ নানা মানসিক চাপে বহুবিধ মানসিক অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি এ কারণে সমাজে, বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতা মহামারির আকার ধারণ করছে। প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল পর্যন্ত গোটা পৃথিবীতে ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ মানসিক চাপ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার মতো ভ্রান্ত পথ বেছে নিয়েছেন। একইসঙ্গে ডব্লিউএইচওয়ের অ-সংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডেভোরা কেস্টেল জানিয়েছেন, সারা বিশ্বের প্রতিটি আত্মহত্যার বিপরীতে ২০টি আত্মহত্যার চেষ্টা চালাচ্ছেন জটিল মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিরা। এ পরিসংখ্যান ক্রমবর্ধমান সামাজিক মাধ্যমের উৎকর্ষতার শতাব্দীতে মৌলিক ও প্রকৃত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে ‘যান্ত্রিক’ মানুষের বিচ্ছেদের বার্তার পাশাপাশি তুলে ধরে মানসিক চাপ মোকাবিলায় আমাদের গৃহীত ভুল কৌশলের কথা। কিন্তু সেই আঙ্গিকের বিপরীতে গঠনমূলক অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ার প্রয়োগ মানুষকে মানসিক চাপের ভার হালকা করায় সহায়তা করতে পারে অনেকটা।
অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ আসলে কী? ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ট্রাপারসোনাল কমিউনিকেশন: ডিফারেন্ট ভয়েসেস, ডিফারেন্ট মাইন্ডস’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে রবার্টস, অ্যাডওয়ার্ডস ও বার্কারের (১৯৮৭) উদ্ধৃতি দিয়ে ইউনিভার্সিটি অব কলোরেডোর যোগাযোগ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডোনা আর. ভোকেট অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লেখেন, একজন ব্যক্তি যেসব শারীরবৃত্তীয় এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় চেতন-অবচেতন মনে নিজের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করে নিজেকে এবং তার চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করেন, তাই হলো অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ।
অন্তর্ব্যক্তিক মিথস্ক্রিয়া একজন মানুষকে তার সংকটকালীন মুহূর্তে নিজেকে এবং নিজের পরিস্থিতি বিবেচনায় আনতে নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই যে একা একা নিজেকে বা নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে চিন্তা করার প্রবণতা, সেটা অবশ্যই গড়ে উঠতে হবে গঠনমূলক পন্থায়। অন্যথায়, মানসিক চাপ হ্রাসের বদলে আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে। এখন মানসিক চাপ মোকাবিলায় অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকে আলোকপাত করা যাক।
সংকট নিয়ে স্ব-কথন: অনেকে একা একা কথা বলাকে নেতিবাচকভাবে নিয়ে থাকেন। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত গঠনমূলকভাবে উদ্ভূত সংকট বা সমস্যা নিয়ে নিজের সঙ্গে আলাপ করা আদতে জীবনমুখী সংকটসমূহ নিরসনের ক্ষেত্রে একটা ভালো কৌশল হতে পারে। এর মাধ্যমে সমস্যা থেকে উত্তরণের পথও খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যদি স্ব-কথনের মাধ্যমে উদ্ভূত সংকটের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, কেন হয়েছে কিংবা কী করণীয় এ ধরনের বিষয়গুলো চিন্তা করা হয় আপাতভাবে। এছাড়া স্ব-কথনের মাধ্যমে মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের আত্মবিশ্বাসকেও ঊর্ধ্বমুখী করতে পারেন, যা তাদের সংকট নিরসনের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে দেয়। একইভাবে জটিল চিন্তন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা ডিসিশন মেকিংয়েও কার্যকরী অবদান রাখে এটি।
স্ব-মূল্যায়ন এবং আত্মসমালোচনার মাঝে ভারসাম্য রক্ষা: অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্ব-মূল্যায়ন। এর মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি নিজের সকল আচরণ আর কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে থাকেন। বৃহত্তর পরিসরে, একজন ব্যক্তি যখন নিজের কোনো কাজ করার সক্ষমতাকে যাচাই করেন বাস্তবতার নিরিখে, সেটাকেই স্ব-মূল্যায়ন বলে অভিহিত করা হয়। এর অভাবে মানুষের মধ্যে সংশয়বাদের বিস্তার ঘটে। হীনমন্যতার জš§ হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন শিক্ষার্থী মনে করতে থাকেন যে, আদৌ আমি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারব কিনা। কিংবা চাকরিপ্রার্থী শঙ্কায় ভোগেন ইন্টারভিউ দিয়ে আমি চাকরি পাব কিনা প্রভৃতি। এক্ষেত্রে সূত্রপাত ঘটে আত্মসমালোচনার। একটি নির্দিষ্ট পরিসীমা পর্যন্ত আত্মসমালোচনা অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে কাজ করে। কেননা এর মাধ্যমে নিজের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে মাত্রাতিরিক্ত আত্মসমালোচনা মনোবল আর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে মানসিক চাপ মোকাবিলায় সবার উচিত স্ব-মূল্যায়ন আর আত্মসমালোচনার অভ্যাসের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা।
স্ব-ধারণায়নের মাধ্যমে বাস্তবতার নিরীক্ষণ: অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের পাটাতনগুলোর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্ব-ধারণায়ন। এর মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে নিজে নিজেই ধারণা এবং দর্শনের উদ্ভাবন করেন। এটা আসলে এক রকম বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরীক্ষণ। একজন ব্যক্তি যখন তার বাস্তবজীবন আর আগের মিথস্ক্রিয়ার অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং বিরাজমান ও ছিন্ন হওয়া সম্পর্কের আলোকে নিজের কর্মপদ্ধতি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কাঠামো দাঁড় করান ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমে, সেটাই হয় স্ব-ধারণায়ন। এর মাধ্যমে মানুষেরা নিজেদের চিন্তাবিন্দুতে একটা ‘সেলফ-ইমেজ’ গড়ে তোলেন। যা মানসিক সংকট নিরসনে নিজেদের জীবনদর্শন কিংবা বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে কার্যকর ও গঠনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষকে সহায়তা করে। তবে এক্ষেত্রে, স্ব-ধারণায়ন যেন মানুষের মধ্যে দম্ভ কিংবা অতি-আত্মবিশ্বাসের জš§ না দেয় সেদিকে সতর্ক থাকাও অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে, কোনো সংকট হতে সহজে উত্তরণ না পেলে, তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
স্ব-প্রতিফলন হতে পারে আত্মউন্নয়নের সোপান: ব্যক্তি কর্তৃক নিজের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, অনুভূতি আর আচরণের পরিবীক্ষণ করার প্রবণতাকে যোগাযোগবিদ এবং মনোবিজ্ঞানীরা ‘স্ব-প্রতিফলন’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। এটি মূলত মানুষকে কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে সংকটকালীন মুহূর্তে অন্তর্দৃষ্টি এবং জটিল চিন্তন দক্ষতার মিশেল তৈরি করে স্বকীয় চিন্তা উৎপাদনে সহযোগিতা করে।
আদতে স্ব-প্রতিফলন প্রক্রিয়াকে বিবেচনা করা যেতে পারে আত্মউন্নয়নের এক দৃপ্ত সোপান হিসেবে। কেননা এর মধ্য দিয়ে একজন মানুষ নিজের অভ্যন্তরীণ সত্তাকে পরখ করে নেয়ার সুযোগ পান, যা জীবনের বহুমুখী সংকট ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তির সবচেয়ে কার্যকর সহায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। ফলে স্ব-প্রতিফলন প্রক্রিয়া পেশাদারি জীবনে ব্যক্তিগত অগ্রগতি এবং উন্নয়ন সাধনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকে পরিণত হয়।
মানসিক চাপ মোকাবিলায় অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের উপায়: মানসিক চাপ মোকাবিলায় অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের বেশকিছু উপায় অনুসরণ করা যেতে পারে বাস্তবজীবনে। ওপরে বর্ণিত কৌশলগুলো প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত মেডিটেশন, ধর্মীয় প্রার্থনা, ডায়েরি লিখন এবং ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মতো অভ্যাস গড়ে তোলা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত মেডিটেশন ব্যক্তি মানুষকে তার সব মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে নিজের কল্যাণ সাধনে চিন্তাভাবনা করতে প্রলুব্ধ করে। পাশাপাশি নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাস একজন ব্যক্তিকে দিনশেষে তার সব কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়, যার ফলে তিনি স্ব-মূল্যায়ন আর স্ব-ধারণায়ন প্রক্রিয়াদ্বয়ের দিকে ফোকাস করে নিজের মানসিক চাপ নিরসন করতে পারেন। একইভাবে জীবনের বিদ্যমান সমস্যা এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে ভিজ্যুয়ালাইজেশনের অভ্যাসও নিজের সঙ্গে অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগে লিপ্ত হয়ে মানুষের মানসিক স্ট্রেস হ্রাসে সাহায্য করে, যা সবচেয়ে বেশি মূর্ত হয়ে ওঠে মুসলমানদের নামাজ বা মোনাজাত, কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনা আর প্রার্থনার সময়। এতে স্রষ্টার কাছে নিজের পরিস্থিতি উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে মানুষেরা আবেগীয় মুক্তি পান। মোটকথা, এ ধরনের গঠনমূলক অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের পন্থাগুলো অনুসরণের মাধ্যমে মানবসমাজ কার্যকরভাবে তাদের সব মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারেন। তবে অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগের সময় অবশ্যই দুশ্চিন্তা, হ্যালুসিনেশন বা অমূর্ত দৃশ্যায়নের মতো অস্বাভাবিক ও ক্ষতিকর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। একইসঙ্গে, মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে কাছের মানুষ, বন্ধু-বান্ধব বা নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে গঠনমূলক মিথস্ক্রিয়া জারি রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
