ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার : বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সরকার কক্সবাজারের টেকনাফ সাবরাং এক্সক্লুসিভ জোন, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু ৯ বছরেও আলোর মুখে দেখেনি এসব প্রকল্প। একই সঙ্গে অনিরাপদ সৈকত, দূষিত পরিবেশ, আবাসন ও পর্যাপ্ত বিনোদন সুবিধা না থাকায় কক্সবাজারে পর্যটক আসছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, সুযোগ থাকার পরও পর্যটন করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এরই মধ্যে সেন্টমার্টিন আসা-যাওয়ার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। এ অবস্থায় ধীরে ধীরে কক্সবাজারবিমুখ হতে পারে দেশীয় পর্যটকরাও। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় একটি খাত মুখ থুবড়ে পড়ছে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে।
তথ্য বলছে, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সরকার ২০১৬ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়ে টেকনাফ ও মহেশখালী উপজেলায় প্রায় ১১ হাজার একর জমিতে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো-ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু ৯ বছর পার হলেও আলোর মুখ দেখেনি এসব প্রকল্প। এমনকি প্রকল্পগুলো এখন আর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায়ও নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক পর্যটনের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হলেও বর্তমানে আমরা পাঁচটি অগ্রাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজ করছি, যার মধ্যে সাবরাং অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে অনেকটা ফাইলবন্দি হয়ে আছে এসব প্রকল্প। যদিও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অজুহাতে অন্তর্বর্তী সরকার সোনাদিয়া ইকো-ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্পটি বাতিল করেছে।
পর্যটকদের অভিযোগ, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সূর্যাস্ত দেখা ছাড়া সময় কাটানোর আর কিছু নেই। পর্যটন স্পট বা বিনোদনের উন্নতি হয়নি। উল্টো সমুদ্রসৈকতকেন্দি ক যেটুকু সৌন্দর্য ছিল, তাও দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া সৈকতে নারীরা হেনস্তা ও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। গোসলে নেমে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে, তা কমানোর উদ্যোগ নেই সরকারের। শুধু কতিপয় উদ্ধারকর্মী দিয়ে ডুবুরির দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। নেই চিকিৎসাসেবাকেন্দ । এ ছাড়া নিয়মনীতি না মেনে পরিচালিত দ্রুত গতির জেটস্কি ও প্যারা সেইলিংয়ের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। মৌসুমের কথা বলে, হোটেলভাড়া, গাড়িভাড়া ও খাবারের দাম বৃদ্ধি করা হয় ইচ্ছামতো। সেদিকে কোনো নজর নেই প্রশাসনের। অথচ কক্সবাজারের তুলনায় ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া হোটেল ভাড়া এবং খাবারের দাম অনেক কম। পর্যটকদের নিরাপত্তাও বেশি। তাই বিদেশিরা কম দামে নিরাপদ জায়গা বেছে নেন। এমনকি বাংলাদেশের অনেক পর্যটক কক্সবাজারের পরিবর্তে বিদেশে ভ্রমণে যাচ্ছে।
কক্সবাজার পর্যটনশিল্প ব্যবসায়ীরাও বিষয়টি স্বীকার করে বিদেশি পর্যটক না আসার পেছনে যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে নিরাপত্তার বিষয়টি একটি বড় ইস্যু। তাদের জন্য নেই কোনো এক্সক্লুসিভ জোন। রাতের বেলায় বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। নেই নাইটলাইফ ও আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্ট। সৈকতও অনেক সময় অপরিচ্ছন্ন থাকে, যা বিদেশিদের কাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এমনকি এখানে ‘সান বাথের’ মতো মৌলিক পর্যটন সুবিধাও নেই। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, তাদের উপযোগী খাবার, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদেশি ভাষা জানা ট্যুর গাইড, নিরাপত্তা, বিনোদন, মানি এক্সচেঞ্জ, শপিং মল, পার্ক, লকার সুবিধা, বসার স্থান, প্রদর্শনী এবং উš§ুক্ত মঞ্চের অভাব। এছাড়া বিচকেন্দি ক পর্যটন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সিনেপ্লেক্স, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, থিম পার্ক, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো, সমুদ্রসৈকত ক্রুজ, প্রমোদতরি, বিশেষায়িত শপিং মল, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন এবং বিদেশিদের জন্য আলাদা জোনের অভাব রয়েছে। এমন অবস্থায় বিদেশি পর্যটক প্রত্যাশা করা হাস্যকর।
কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মইনুল হাসান পলাশ বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন শুরু থেকেই পরিকল্পনাহীন ও অগোছালো। এখানে মানসম্মত দেশীয় পর্যটনও গড়ে ওঠেনি। অথচ মানসম্মত দেশীয় পর্যটন গড়ে উঠলে তার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক পর্যটন দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটকরা কংক্রিট বা সাগরের ঢেউ গুনতে আসবেন না। তারা আসবে প্রকৃতির টানে সৌন্দর্য উপভোগ করতে। অথচ কক্সবাজারে বিদেশিদের আকৃষ্ট করার মতো কোনো কিছুই গড়ে তোলা হয়নি। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভবনাময় পর্যটন খাতটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
হোটেল সি-প্রিন্সেসের ম্যানেজার মাজেদুল বশার চৌধুরী সুজন বলেন, কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুমে ২০ থেকে ২৫ লাখ পর্যটক আসেন। অথচ বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা হিসেবের খাতায় একেবারেই শূন্য।
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা ব্যবসায়ী মোকাম্মেল হোসেন বলেন, আরও কয়েকবার কক্সবাজারে এসেছি, কিন্তু এখানে সবকিছুই আগের মতো। বরং এখন আরও বেশি শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। সমুদ্রের বালিয়াড়ি দখল করে যেখানে-সেখানে দোকানপাট, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, ভিক্ষুক, ছিনতাইকারী ও ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মীর ভিড় বেড়েছে। এত মানুষ সমুদ্রে গোসল করছে, অথচ নেই কোনো আধুনিক চেঞ্জিং রুম। কয়েকটা অস্বাস্থ্যকর ঘর বানিয়ে পর্যটকদের বাথরুম ও গোসল করানো হচ্ছে।
অপর পর্যটক জামশেদ হোসাইন জানান, লাইটিং ব্যবস্থা না থাকায় রাত গভীর হলে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অপরাধীরা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। হোটেল-মোটেল জোনের নির্জন জায়গাগুলোও নিরাপদ নয়।
তাদের অভিযোগ, কক্সবাজারে আবাসন, যাতায়াত, খাবারে যা ব্যয় হয় তা দিয়ে অনায়াসে বিদেশ ভ্রমণ সম্ভব। বিদেশভ্রমণ করতে পারলে কক্সবাজার কেন আসবেÑএমন প্রশ্নও করেন তারা।
কক্সবাজার কলাতলীতে অবস্থিত তারকা মানের হোটেল সায়মান বিচ রিসোর্টের সিনিয়র অফিসার আসাদুজ্জামান নুর বলেন, হোটেলটিতে লাইসেন্সকৃত বার, সুইমিংপুল, সি-বিচে বসার ব্যবস্থা, রেস্টুরেন্ট, জিমনেসিয়াম, কনফারেন্স হলসহ আন্তর্জাতিক মানের যাবতীয় সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারে এ রকম আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হোটেল রয়েছে।
ট্যুারিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য ট্যুারিস্ট পুলিশ সদস্যরা সর্বদা প্রস্তুত। এরই মধ্যে চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারসহ যেসব হোটেলে পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি কক্সবাজারে ঘুরতে এসে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া ২১৯ জন শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিসিটিভি স্থাপন, টহল জোরদার, লাইটিং ব্যবস্থা ও অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হয়েছে। এককথায় পর্যটকরা যেন নিরাপদে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারেন, সেজন্য সচেষ্ট রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের সুবিধা ও নিরাপত্তায় প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে। যেকোনো অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সায়েমা শাহীন সুলতানাকে ০১৯…০০০ নাম্বারে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে ই-মেইল করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post