নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : বিগত ৫৪ বছরের পথচলায় সাফল্যের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় করেছে। এর মধ্যে দিয়ে সংস্থাটির নিট মুনাফা অর্জন হয়েছে ৩০৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফা। এমন অভাবনীয় সাফল্যের পর ঋণের কিস্তি বাবদ সরকারের অনুকূলে ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেছে সংস্থাটি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে এই চেক হস্তান্তর করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
এ সময় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে তাদের এই মুনাফার ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিএসসি, তা ধরে রাখতে হবে। ভবিষ্যতে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে এই প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানই আরও শক্তিশালী হয়, বহরে নতুন নতুন জাহাজ যুক্ত হয়। বিএসসির বহরে নতুন জাহাজ যুক্ত হলে নাবিকদের মধ্যে উৎসাহ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী দিয়ে ধরে রাখতে হবে, যাতে তারা বিশ্বমানের নাবিক তৈরি করতে পারে।
চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জি-টু-জি ভিত্তিতে ছয়টি নতুন জাহাজ সংগ্রহের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় তিনটি নতুন প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং তিনটি নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা প্রায় ৩৯ হাজার ডেডওয়েট টন। এই প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকার (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) ও চীন সরকারের (চায়না এক্সিম ব্যাংক) মধ্যে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর একটি ঋণচুক্তি হয়। ঋণের মূল অর্থের পরিমাণ ১১৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭০ ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনসহ আরও অনেকে।
জানা যায়, ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অর্থ বিভাগ ও বিএসসির মধ্যে একটি সাবসিডিয়ারি লোন এগ্রিমেন্ট (এসএলএ) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী মোট ২ হাজার ৪২৫ কোটি ২ লাখ টাকা ১৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারকে পরিশোধ করবে বিএসসি। চুক্তি অনুযায়ী গ্রেস পিরিয়ডকালীন সুদের অর্থ বাবদ ৪৭৫ কোটি ২৫ লাখ ১৩ হাজার ৩৪০ টাকার একটি চেক ২০২৪ সালের গত ২৬ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ যুক্ত হয় বিএসসির বহরে। এর মধ্যে পাঁচটি জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা, এমভি বাংলার অর্জন, এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা, এমটি বাংলার অগ্রদূত এবং এমটি বাংলার অগ্রগতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে।
এ-সংক্রান্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএসসি ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় করেছে। তাতে রেকর্ড ৩০৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে বহরে যুক্ত নতুন পাঁচটি জাহাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় বিএসসি নতুন জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের আওতায় প্রথম জাহাজ ‘বাংলার প্রগতি’ ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর বহরে যুক্ত হবে। দ্বিতীয় জাহাজ ‘বাংলার নবযাত্রা’ আগামী ৩০ জানুয়ারি হাতে পাবে বিএসসি। এছাড়া সরকারি অর্থায়নে দুটি এমআর প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার, নিজস্ব অর্থায়নে একটি অলট্রাম্যাক্স আকারের বাল্ক ক্যারিয়ার এবং চীন থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে আরও চারটি বড় জাহাজ সংগ্রহের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা করার কথা জানায় বিএসসি।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post