শেখ মোহাম্মদ রতন, মুন্সীগঞ্জ : মেঘনা নদী ঘিরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় লাইটার ভেসেল থেকে তেল তথা ডিজেল চোরাচালানের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে ওই সিন্ডিকেট। ইতোমধ্যে দিনে-দুপুরে লাইটার ভেসেল থেকে তেল চুরির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই ভিডিও থেকে ডিজেল চোরালান সিন্ডিকেটের এহের অপকর্মের চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিপিসির লাইটার ভেসেল থেকে তেল তথা ডিজেল চুরি করা হচ্ছে।
জেলার গজারিয়া উপজেলার ভাটিবলাকী এলাকা সংলগ্ন মেঘনাবক্ষে লাইটার জাহাজ থেকে ডিজেল তোলা হয়ে থাকে ট্রলারে। পরে মেঘনা নদীর একই উপজেলার তেতৈতলা পুরাতন ফেরীঘাটে সেই ডিজেল খালাস করা হয়ে থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, ১৮ বছর আগে মেঘনা নদীতে তেল চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন জিএম বোরহান নামে এক ব্যক্তি। তিনি স্থানীয়ভাবে ‘গোপালী বোরহান’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে বিগত সরকারের ডিএমপির সাবেক এক পুলিশ কমিশনারের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে মেঘনা পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় ডিজেল চুরির সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনরোষে পড়ে তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় কয়েকজনকে ম্যানেজ করে আবারও সক্রিয় হয়েছেন।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এমভি আকিজ-বশির-৪ নামে ভেসেল থেকে ডিজেল পাচারের দৃশ্য চোখে পড়েছে। ভিডিওতে এক যুবককে বলতে শোনা যায় স্থানীয় ‘মাসুম’ নামে এক ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই তারা এই কারবার চালাচ্ছেন। তাছাড়া গত সোমবার জেলার গজারিয়া উপজেলার ভাটিবলাকী এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এমভি আকিজ-১৪ নামে একটি লাইটার ভেসেল থেকে ট্রলারে করে ডিজেল পাচার করার চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। ওই সময় লাইটার ভেসেল থেকে অন্তত ২০টি গ্যালনে অন্তত হাজার লিটার ডিজেল ট্রলারে খালাস হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা খোকন মিয়া বলেন, মেঘনার মোহনায় বিশেষ করে নদীর ভাটিবলাকী এলাকায় প্রায়ই দেখি লাইটার ভেসেল বা জাহাজ থেকে তেল নামানোর দৃশ্য আমরা দেখে আসছি। কখনো পাইপ দিয়ে আবার কখনো গ্যালনে করে জাহাজ থেকে হাজার হাজার লিটার তেল নামানো হয়।
আগে রাতের আঁধারে এই অপকর্ম চললেও এখন তা দিনের আলোতেই ঘটছে। স্থানীয় অপর আরেক বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এখন চোরাকারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নদীপথে জাহাজ থেকে এ ডিজেল পাচার করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত জিএম বোরহান বলেন, আমি এখন এই ব্যবসায় জড়িত নেই। বর্তমানে আমি ঢাকায় থাকি। দীর্ঘদিন গজারিয়া উপজেলায় যাইনি। কারো সাথে মিলে বা অন্য কারো মাধ্যমে আমি এই ব্যবসা পরিচালনা করছি না। অন্য অভিযুক্ত ভাটিবলাকী গ্রামের মাসুম বলেন, ভিডিওতে কেন আমার নাম বলা হয়েছে- তা আমার জানা নেই। আমার বৈধ ব্যবসা রয়েছে। আমি কোনো অপকর্মের সাথে জড়িত নই।
আকিজ-বশির গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. কবির হাসান বলেন, এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে আমাদের একটি লাইটার ভেসেল থেকে তেল নামিয়ে ফেলা হচ্ছে। বিষয়টি আমি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এ ঘটনা সাংবাদিকদের মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। তাৎক্ষনিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে অবগত করা হয়েছে। শিগগিরই নৌ-পুলিশ, থানা পুলিশ এবং গোয়েন্দা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চালানো হবে।
