নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজেদের কৌশলগত বা পর্যাপ্ত জানাশোনা না থাকায় পুঁজিবাজারে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনাবেচা করেন হুজুগে, গুজবে, কিংবা অন্যের কথা শুনে। লাভের আশায় এভাবে বিনিয়োগ করলেও বেশিরভাগ সময়ই তার ফল শুভ হয় না। এ কারণেই ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকছেন ভালো মৌলভিত্তির বা ফান্ডামেন্টাল কোম্পানির দিকে। তাদের অভিমত, এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে লাভ কম হলেও লোকসানের ঝুঁকি কম। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন বাজারসংশ্লিষ্টরাও। দীর্ঘদিন থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছেনÑএমন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের পছন্দের তালিকায় কিছু ভালো মৌলভিত্তির কিছু কোম্পানি রয়েছে।
দেশের পুঁজিবাজারে গত কয়েক মাসে মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার কেনার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক, বিমা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑটেলিযোগাযোগ খাতে কোম্পানি গ্রামীণফোন, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্যাংক খাতের কোম্পানি ব্র্যাক ব্যাংক, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বায়োটেক খাতের রেনাটা, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ কোম্পানি, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ইস্টার্ন ব্যাংক, টেক্সটাইল খাতের মোনা স্পিনিং মিলস এবং ব্যাংকং খাতের দি সিটি ব্যাংক।
এই কোম্পানিগুলো তাদের খাতে শক্তিশালী মৌলিক ভিত্তি ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, যেখানে সুদের হার কমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে, বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল আয় উৎস খুঁজছেন। মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেয়, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য আয় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংক ও বীমা খাতের কোম্পানিগুলো তাদের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির কারণে এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মৌলভিত্তিক কোম্পানির শেয়ার কেনা একটি নিরাপদ বিনিয়োগ কৌশল। এই কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ওঠানামা তুলনামূলকভাবে কম এবং লভ্যাংশের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নিয়মিত আয় পাচ্ছেন।’
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার ভবিষ্যতেও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ নীতি পর্যালোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগকারী বলেন, ‘আগে আমি প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বেশি কিনতাম, কিন্তু এখন মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার কিনছি। লভ্যাংশের মাধ্যমে নিয়মিত আয় পাচ্ছি, যা আমাকে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল রাখছে।’
এদিকে ‘জেড ক্যাটাগরির’ কোম্পানিগুলোর শেয়ার বড় ধরনের ক্রেতা সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বেশির ভাগ জেড গ্রুপের শেয়ারের বড় দরপতন হয়েছে। এমনকি ডজন খানেক কোম্পানির শেয়ার ক্রেতা সংকট দেখা যায়।
বিনিয়োগকারীদের মতে, জেড ক্যাটাগরির শেয়ারের বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া যে কোনো সময় এসব কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর বন্ধ হয়ে গেলেই তাদের পুরো টাকা জলে যাবে। জেনেশুনে কেন এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করব।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সা¤প্রতিক সময়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে কোম্পানির অতিরিক্ত বৃদ্ধি পুঁজিবাজারের লেনদেন কমার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি। যেকোনো কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পড়লে তার শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় এবং লেনদেন নিষ্পত্তি সময় তিন দিন পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেশি। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এই শেয়ারগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত ১৫ বছরে ১৩৪টি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি অনুমোদন করেছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো ভালো ফল বয়ে আনতে পারেনি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই তালিকাভুক্ত হওয়ার পর মুনাফা করার সক্ষমতা কমেছে। ফলে তাদের জেড ক্যাটাগরিতে (মন্দ খাতে) নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনেকের মতে, ১৫ বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজারে চরম অনিয়ম, অপশাসন ও অস্থিরতা চলছে। ফলে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান প্রায় অকার্যকর হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত রিটার্ন এবং মূলধন কমেছে। প্রকৃত অর্থে বাজার প্রায় ৪০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। তালিকাভুক্ত হয়েছে মানহীন আইপিও (প্রাথমিক শেয়ার)। এর মাধ্যমে বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। বাজারে তৈরি হয় স্থায়ী তারল্য সংকট। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পরিচালনাকারী সংস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং আর্থিক নিরীক্ষক, রেটিং এজেন্সিসহ অন্যান্য অংশীজনের মাঝে দেখা দেয় সুশাসনের অভাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থা বিরাজ করছিল। বিনিয়োগকারীরা বাজার নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা বাজারে ফিরতে শুরু করেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাজারে এখনো অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার অবমূল্যায়িত অবস্থায় আছে। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত মন্দ ও বন্ধ কোম্পানির শেয়ার না কিনে ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা।

Discussion about this post