Print Date & Time : 20 May 2026 Wednesday 11:21 am

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে

নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সেটি অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান এসব কথা বলেন।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সংলাপে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি, প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায় না বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হলে অবশ্যই সরকারের কর আদায়ও বাড়াতে হবে। কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা আবদ্ধ হয়েছি, সেটিও সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে।
তিনি বলেন, সরকারের ঋণ বাড়ছে, বিপরীতে উন্নয়ন চাহিদাও বাড়ছে। আগামী বাজেটে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। আইএমএফও এখন বলছে যে, বাংলাদেশ ঋণের চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর আদায় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আহরণের টার্গেট নেওয়া হচ্ছে, তাতে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধ অর্জন করতে হবে। এটি বর্তমান কাঠামোতে সম্ভব কিনা, সেটি আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশে ২০১১ সালে রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের একটু বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এরপর আর কখনও রাজস্ব আদায়ে এতটা প্রবৃদ্ধি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, কর আদায় বাড়াতে হলে আদায়ের পরিধি বাড়াতে হবে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু খাতে করহার কমাতেও হবে। কর আদায় না বাড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে জনগণ কতটা দিচ্ছে এবং কতটা ফেরত পাচ্ছে, সেটির মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এখানে জনগণের থেকে নিয়ে কতটা দুর্নীতি হচ্ছে তার মেজারমেন্ট হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, আগামী বাজেটে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ হিসেবে ব্যয় করতে হবে। এরকম ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোয়িং বিমান চুক্তিসহ যেসব চুক্তি হয়েছে, তাতে শুল্কছাড়ের কথা বলা হচ্ছে। বস্তুতপক্ষে শুল্কহার কমবে কিনা, সেটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। বাংলাদেশ শুল্কছাড় পেলে অন্যান্য দেশগুলোকে তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটিও ভাবা দরকার। অন্যান্য দেশেও শুল্ক কমবে কিনা?
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, খাতভিত্তিক বরাদ্দ দুই-এক বছর না বাড়িয়ে কোয়ালিটিতে জোর দেওয়া উচিত। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোয় বরাদ্দ বাড়লেও লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় তফাত দেখা গেছে। মাঝখানে বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়। বস্তুতপক্ষে বরাদ্দ না বাড়িয়ে কোয়ালিটি বজায় রেখে ব্যয় হলে আমাদের বাজেট ঘাটতিও কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও বিদ্যুৎ সমস্যা এখনও দূর হয়নি। বর্তমান সরকারের বয়স যেহেতু মাত্র ৩ মাস, সেহেতু আমরা এখনই তাদের দোষ দিতে চাই না। তবে এর মধ্যে বেশ কিছু উন্নতিও আমরা দেখেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও এখন সেটি অনেকটা দূর হয়েছে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ না বাড়লেও সামনের দিনগুলোয় তা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এবং বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন অযোগ্য। পাশাপাশি এটি পুরোনো সংস্কৃতির ধারায় নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক বিভিন্ন চাপের মধ্যে রয়েছে। বর্তমান সরকারেরও বয়স এখন পর্যন্ত তিন-চার মাস চলছে। এই সরকার অর্থনীতিকে কতটা দুর্বল অবস্থায় পেয়েছেন, সেটি এখনও তারা স্পষ্ট করতে পারেনি। তারাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে পারতেন, কিন্তু সেটি তারা করেননি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলেও অর্থনীতি কীভাবে স্থিতিশীল হবে সেটা নিয়ে আলোচনা খুবই সামান্য। মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সামাল দেবেন, কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়ানো যাবে এই বিষয়গুলোয় তারা যথাযথভাবে ফোকাস করছেন না।
সিপিডির এই ফেলো বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট ৪০-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত অবাস্তবায়িত থেকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য ২০-২৫ শতাংশ উন্নয়ন বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা পুরোনো সংস্কৃতির ধারায় চলছে। এটি অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একইভাবে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে এটিও অবাস্তব। নতুন একটি সরকার দায়িত্বে এসেই রাজস্ব আহরণের টার্গেট এক থেকে দেড় লাখ কোটি বাড়িয়ে দেওয়াটা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। এটি রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে আদায় করাও সম্ভব হবে না। এমনিতেই বিগত বছরগুলোয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তার ওপরে এই বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে সেটি আদায় সম্ভব হবে কিনা এটি নিয়ে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।